
মোহাম্মদ গোলাম মাওলা
মুহাদ্দিস, সৎপুর দারুল হাদিস কামিল মাদ্রাসা, বিশ্বনাথ, সিলেট
প্রতিবেদন: আল আমিন সুমন আহমদ ।। সিলেট প্রতিনিধি
মানবজাতির ইতিহাসে এমন কিছু মহামানবের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন ও আদর্শ যুগে যুগে মানুষের জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে আছে। তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তিনি শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় নেতা নন; বরং ন্যায়, মানবতা, সাম্য, সহমর্মিতা ও শান্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবনচরিত বা ‘সিরাত’ মানবসভ্যতার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ও আদর্শের নাম।
ষষ্ঠ শতাব্দীর আরব ছিল অজ্ঞতা, কুসংস্কার, গোত্রীয় সংঘাত, নারী নির্যাতন ও সামাজিক বৈষম্যে পূর্ণ। এমন এক সময় ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে (আমুল ফীল) মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর পিতা ছিলেন আবদুল্লাহ এবং মাতা আমিনা (রা.)।
জন্মের আগেই তিনি পিতৃহারা হন এবং মাত্র ছয় বছর বয়সে মাতাকেও হারান। এরপর দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিবের স্নেহ-ছায়ায় তিনি বেড়ে ওঠেন।
শৈশব থেকেই সত্যবাদিতা, সততা ও আমানতদারিতার জন্য তিনি মক্কার মানুষের কাছে ‘আল-আমীন’ (বিশ্বস্ত) নামে পরিচিতি লাভ করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সততা ছিল প্রশ্নাতীত।
তরুণ বয়সে তিনি ‘হিলফুল ফুযূল’ নামে একটি ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল দুর্বল ও নির্যাতিত মানুষের অধিকার রক্ষা।
৪০ বছর বয়সে মক্কার হেরা গুহায় ইবাদতরত অবস্থায় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াতের মাধ্যমে নবুওয়াতের সূচনা ঘটে।
তিনি মানুষের সামনে এক আল্লাহর ইবাদত, ন্যায়বিচার, সত্যবাদিতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। কিন্তু এই আহ্বানের কারণে তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদের দীর্ঘদিন কঠোর নির্যাতন, সামাজিক বয়কট ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়।
তায়েফে প্রস্তরাঘাতে রক্তাক্ত হওয়ার পরও তিনি প্রতিশোধ চাননি; বরং আল্লাহর কাছে তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করেছিলেন। এখানেই ফুটে ওঠে তাঁর অসীম দয়া ও ক্ষমাশীলতা।
৬২২ খ্রিস্টাব্দে আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ইসলামী হিজরি সনের সূচনা হয়।
মদিনায় পৌঁছে তিনি মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়ন করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিখিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি।
ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা ও আত্মরক্ষার প্রয়োজনে মহানবী (সা.) বদর, উহুদ ও খন্দকের মতো গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।
৬৩০ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রায় রক্তপাতহীনভাবে মক্কা বিজয় করেন। বিজয়ের পর প্রতিশোধ না নিয়ে শত্রুদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। ইতিহাসে এমন ক্ষমাশীলতার নজির খুবই বিরল।
১০ম হিজরিতে বিদায় হজের সময় আরাফাতের ময়দানে মহানবী (সা.) যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, তা আজও মানবাধিকারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘোষণাপত্র হিসেবে বিবেচিত।
তিনি ঘোষণা করেন—
১১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়ালে (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) ৬৩ বছর বয়সে মহানবী (সা.) ইন্তেকাল করেন। তিনি মদিনার রওজা মুবারকে সমাহিত আছেন।
তাঁর ইন্তেকালের প্রায় দেড় হাজার বছর পরও তাঁর শিক্ষা, নৈতিকতা, রাষ্ট্রচিন্তা, বিচারব্যবস্থা, পারিবারিক আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবনকে আলোকিত করছে।
হিংসা, বৈষম্য, দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের এই সময়ে মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ নতুন করে মানবতার সামনে শান্তি, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচারের পথ দেখায়। তাঁর সিরাত কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; বরং একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই অনুসরণযোগ্য।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—
"নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের জীবনের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।"
— সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২১
ই-পেপার
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিজানুর রহমান