মানিকগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি ।।মো. ফরিদ হোসেন
বাড়ছে উদ্বেগ, জনমনে প্রশ্ন—মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
শান্ত ও নিরাপদ জেলা হিসেবে পরিচিত মানিকগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক হত্যা, অস্বাভাবিক মৃত্যু, গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। মাত্র তিন মাসে জেলায় ১০টি হত্যাকাণ্ড এবং ৫৭টি অপমৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে শুধু এপ্রিল মাসেই ৯টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, পারিবারিক কলহ, জমিজমা ও তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিরোধ, মাদকের প্রভাবসহ নানা সামাজিক অস্থিরতা এসব ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে। এক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি ঘটনায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।
গত ১৬ এপ্রিল মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার হাটিপাড়া ইউনিয়নের বনপারিল দক্ষিণপাড়া এলাকায় আতিকা আক্তার নামে সাত বছরের এক শিশুর মরদেহ ভুট্টাক্ষেত থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে স্বর্ণালঙ্কার লুটের উদ্দেশ্যে শিশুটিকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
এ ঘটনার পর উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির বাবা পান্নু মিয়া ও চাচা ফজলু মিয়া নিহত হন। এ ঘটনা জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।
এর মাত্র দুই দিন পর, ১৮ এপ্রিল শিবালয় উপজেলায় গ্রাম্য সালিশ চলাকালে নাজমা আক্তার নামে এক তরুণীকে প্রকাশ্যে মারধর ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি নিজ ঘরে আত্মহত্যা করেন।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা ১১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২৪ এপ্রিল সিংগাইর উপজেলার গোলড়া মহল্লায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ছোট ভাইয়ের হামলায় নজরুল খন্দকার (৬০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। পরে বিরোধ মীমাংসার জন্য সালিশি বৈঠক বসলে সেখানেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
মে মাসের শেষদিকে মানিকগঞ্জে পৃথক দুটি ঘটনায় এক রাতেই তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ৩০ মে দিবাগত রাতে সদর ও দৌলতপুর উপজেলায় এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
সদর উপজেলার পুটাইল ইউনিয়নের উত্তর পুটাইল গ্রামে পূর্বশত্রুতার জেরে সজিব হোসেন নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। একই রাতে দৌলতপুরে পারিবারিক বিরোধের জেরে মা ও ছেলেকে হত্যার ঘটনা ঘটে।
একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে।
পুলিশের হিসাবে তিন মাসে ৫৭টি অপমৃত্যুর মামলা হওয়াও উদ্বেগের বিষয়। তবে এসব ঘটনার সবগুলো হত্যাকাণ্ড নয়। অপমৃত্যুর মধ্যে আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু কিংবা অন্যান্য অস্বাভাবিক মৃত্যুও থাকতে পারে। তাই ৫৭টি ঘটনাকে সরাসরি হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে বিপুলসংখ্যক অপমৃত্যুর ঘটনা জেলার সামগ্রিক সামাজিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম জানিয়েছেন, বেশিরভাগ ঘটনা পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব থেকে ঘটছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, শুধু ঘটনার পর মামলা ও গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের বিস্তার, পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা নিয়ে সংঘাত, সামাজিক অবক্ষয়, সালিশের নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং অপরাধপ্রবণতার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বিশেষ করে কোনো বিরোধ যেন হত্যা কিংবা সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় হতে হবে। পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা বাড়ানো জরুরি।
মানিকগঞ্জের মানুষ স্বাভাবিক ও নিরাপদ পরিবেশে জীবনযাপন করতে চায়। কিন্তু যখন মাত্র তিন মাসে ১০টি হত্যাকাণ্ড এবং ৫৭টি অপমৃত্যুর তথ্য সামনে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—মানুষের নিরাপত্তা আসলে কোথায়?
এটাই কি আমাদের শান্তির মানিকগঞ্জ?
হত্যা ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়। তাই মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, পরিবার, সমাজ, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
মানুষ আতঙ্ক নয়, নিরাপদ মানিকগঞ্জ চায়।
ই-পেপার
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিজানুর রহমান