বান্দরবানের লামা উপজেলার ৩ নম্বর ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ ‘কাঠালছড়া সড়ক’ এখন যেন এক চরম দুর্ভোগের নাম। ইটের ভাটার ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচলের কারণে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে যোগাযোগের এই প্রধান মাধ্যমটি। একদিকে সড়কের বেহাল দশা, অন্যদিকে স্থানীয় দুর্ভোগের সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে ‘পিবিএন ইটভাটা’র মালিক নাছির কোম্পানির বিরুদ্ধে। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
ভোগান্তির পথ ও সংবাদের মাশুল
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাঠালছড়া সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে চলাচল করতে হয়। কিন্তু বিগত কিছুদিন ধরে পিবিএন ইটভাটার ভারী ট্রাক ও গাড়ি চলাচলের কারণে সড়কের বিভিন্ন স্থান দেবে গিয়ে বিশালাকার খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্ভোগ সইতে না পেরে সম্প্রতি স্থানীয় যুবসমাজ ও ভুক্তভোগীরা একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ জানান।
ঘটনার বিবরণ পেয়ে সরেজমিন পরিদর্শনে যান বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী। এর ভিত্তিতে 'মানবাধিকার প্রতিদিন'-এর বান্দরবান জেলার বিশেষ প্রতিনিধি আলাউদ্দিন, 'Dhaka Today TV', 'জনতার দেশকণ্ঠ', 'দৈনিক আমার বাংলাদেশ প্রতিদিন', 'চট্টলা ট্রিবিউন'-এর প্রতিনিধি এবং 'NBTV'-এর সংবাদদাতা সাদ্দাম হোসেনসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
বাজারে প্রকাশ্যে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ
সংবাদ প্রকাশের পরপরই চটে যান ইটভাটার মালিক নাছির কোম্পানি। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গত ২৮ আগস্ট ইয়াংছা বাজারে সাংবাদিক সাদ্দাম হোসেনসহ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকে প্রকাশ্যে পেয়ে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা তাকে থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
অভিযোগ রয়েছে, ধমক ও অকথ্য গালিগালাজের পাশাপাশি তিনি স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করেন। ‘তার কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারবে না’—এমন দম্ভোক্তি প্রকাশ করে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের মা-বোন তুলে অশালীন গালি দিতে থাকেন। প্রকাশ্য বাজারে এমন অসভ্য আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সচেতন মহল ও বান্দরবানের সাংবাদিক সংগঠনগুলো।
প্রভাবশালী পরিচয়ের আড়াল
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিতর্কিত ইটভাটা মালিক নাছির কোম্পানি চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর ভাই। স্থানীয়দের দাবি, বিগত সরকারের আমলেও এলাকায় তার ক্ষমতার মহড়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এমনকি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের বহরে গুলিবর্ষণের ঘটনার পেছনেও তার সম্পৃক্ততা ছিল বলে এলাকায় চোরো গুঞ্জন রয়েছে। তবে এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনিক কোনো স্পষ্ট বক্তব্য বা নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন এখনো সামনে আসেনি।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
জনগুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক ভাঙাচোরা হয়ে মানুষের চলাচলের অযোগ্য হয়ে গেলেও কেন প্রশাসনিক কোনো হস্তক্ষেপ নেই—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, ক্ষমতার দাপট ও ইটভাটা মালিকদের দাপটের কাছে স্থানীয় প্রশাসন যেন জিম্মি হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, "জনগণের করের টাকায় তৈরি রাস্তা ভাটার ভারী গাড়িতে নষ্ট হবে, আর প্রতিবাদ করলে শুনতে হবে গালি? প্রশাসন কি প্রভাবশালীদের চাপে চুপ মেরে আছে?"
জনগণের দাবি স্পষ্ট
জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের হেনস্তা ও গালিগালাজের বিচার দাবি করেছে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা। একই সঙ্গে কাঠালছড়া সড়কের দ্রুত সংস্কার, ভারী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং নাছির কোম্পানির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন লামাবাসী।