সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ইসলামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠা ও অনুশীলনের জন্য দাওয়াহ তথা দ্বীনের দাওয়াতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। জনসাধারণকে ইসলামের সঠিক শিক্ষা দেওয়া, ইসলাম বোঝানো এবং ব্যক্তি ও সমাজজীবনের সর্বস্তরে ইসলামের অনুশীলনের প্রচেষ্টা চালানোই দাওয়াহর মূল লক্ষ্য।
ইসলামে দাওয়াহর দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক মুসলিম তার সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য, নৈতিকতা ও সঠিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা, উত্তম পদ্ধতি, নম্রতা ও সুন্দর আচরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের পথে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান কর এবং তাদের সঙ্গে উত্তম পন্থায় বিতর্ক কর।’ (সূরা আন-নাহল: ১২৫)
দাওয়াহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো নিজের আমল ও আচরণের মাধ্যমে ইসলামের শিক্ষা তুলে ধরা। সততা, আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবিকতা ও সদাচরণের মাধ্যমে একজন মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য অন্যদের সামনে তুলে ধরতে পারেন। পাশাপাশি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসৃত পদ্ধতি অনুযায়ী ধাপে ধাপে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা মানুষের কাছে উপস্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সমাজের বিভিন্ন স্তরে দাওয়াহ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবারকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। দাওয়াহর কাজ শুরু হওয়া উচিত নিজের ঘর থেকেই। পরিবারে দ্বীনি পরিবেশ সৃষ্টি হলে এর ইতিবাচক প্রভাব সমাজেও পড়বে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মক্তব, মাদ্রাসা, দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্র এবং আধুনিক যোগাযোগমাধ্যমের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমেও ইসলামের সঠিক জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে তরুণ সমাজের কাছে দাওয়াহ পৌঁছাতে তাদের মনস্তত্ত্ব ও সমসাময়িক প্রযুক্তি ও যোগাযোগমাধ্যমকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবী মহলেও ইসলামের নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে সততা, দায়িত্বশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে ইসলামের আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিনির্ভর আলোচনার মাধ্যমে ইসলামের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক শিক্ষাগুলো তুলে ধরা সম্ভব।
সাধারণ মানুষের কাছে দাওয়াহ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মসজিদের খুতবা, ওয়াজ মাহফিল, দ্বীনি বইপত্র, ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনা এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইসলামের মৌলিক বিষয়—আকিদা, ইবাদত ও আখলাক—সহজ ও ইতিবাচক ভাষায় মানুষের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডও দাওয়াহর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আর্তমানবতার সেবা করা এবং সামাজিক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ও নৈতিক ভূমিকা পালনের মাধ্যমে ইসলামের মানবিক সৌন্দর্য তুলে ধরা সম্ভব।
দাওয়াহর মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে আল্লাহর পরিচয় ও ইবাদতের দিকে আহ্বান করা, কুসংস্কার ও অনৈতিকতা থেকে সমাজকে মুক্ত করার চেষ্টা করা এবং ন্যায়, সততা, মানবিকতা ও শান্তির ভিত্তিতে একটি সুন্দর সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা।
এ প্রসঙ্গে হযরত আলী (রা.)-কে উদ্দেশ করে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, কোনো একজন ব্যক্তির হিদায়াতের কারণ হওয়া দুনিয়ার মূল্যবান সম্পদের চেয়েও উত্তম। এ হাদিস দাওয়াহর মর্যাদা ও গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ঐ ব্যক্তির কথার চেয়ে কার কথা উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে—নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সূরা ফুসসিলাত: ৩৩)
দাওয়াহর ক্ষেত্রে তাই কঠোরতা বা বিরোধ সৃষ্টি নয়; বরং প্রজ্ঞা, ধৈর্য, উত্তম আচরণ, মানবিকতা ও সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে মানুষের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়াই হওয়া উচিত মূলনীতি।
দ্বীনের দাওয়াহকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি নৈতিক, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে দ্বীনের দাওয়াহর কাজে কবুল করুন এবং ইসলামের সঠিক শিক্ষা মানুষের কাছে সুন্দরভাবে পৌঁছে দেওয়ার তাওফিক দান করুন।
মাওলানা শাহ্ মোঃ মাসউদুর রহমান
সহ-সভাপতি, আইএবি ময়মনসিংহ জেলা দক্ষিণ শাখা
ই-পেপার
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিজানুর রহমান