কিশোরগঞ্জ পৌরসভার উন্নয়নকাজে ৬১ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগে অডিট আপত্তি হয়েছে—এমন দাবি করে সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও একটি পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ কম করে বিল উত্তোলন, নকশাবহির্ভূত নির্মাণ ও ভুয়া প্রাক্কলনের মতো অভিযোগ তোলা হয়।
তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অডিট আপত্তির দাপ্তরিক নথি খুঁজতে গিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন কিশোরগঞ্জ পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের ভাষ্য, প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে অডিট আপত্তির কথা বলা হয়েছে, সেই আপত্তির কোনো চিঠি পৌরসভায় পাওয়া বা নিবন্ধিত হওয়ার তথ্য তাঁদের কাছে নেই।
পৌরসভার হিসাব শাখা, প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ধরনের অডিট আপত্তির কোনো দাপ্তরিক নথি তাঁদের কাছে পাওয়া যায়নি। এমনকি পূর্বে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করে এ ধরনের চিঠির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গত ২৮ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টের বরাত দিয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়নকাজে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়। তবে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট প্রকল্প, স্থান, ওয়ার্ড কিংবা অডিট আপত্তির স্মারক নম্বর উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে ৬৫ মিটার ড্রেন নির্মাণের পরিবর্তে ৫৫ মিটার নির্মাণ করে অতিরিক্ত ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগও করা হয়। তবে কোন ওয়ার্ডে, কোন প্রকল্পের আওতায় এবং কখন ওই ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, বিগত সময়ে ৬৫ মিটারের নির্দিষ্ট কোনো ড্রেন প্রকল্পের তথ্য তাঁদের জানা নেই। মাঠপর্যায়ে জনগণের চাহিদা ও বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে কোনো কোনো কাজের দৈর্ঘ্যে কিছুটা কমবেশি হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের তথ্য ছাড়া এ ধরনের অভিযোগ বিভ্রান্তিকর।
এছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্ডে ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকার স্লাব নির্মাণ এবং পুরোনো সড়কের নিচে সলিং দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জুয়েল হক বলেন, অভিযোগে কোনো ওয়ার্ড, প্রকল্প বা নির্দিষ্ট কাজের স্থান উল্লেখ করা হয়নি। শুধু আনুমানিক ভাউচারের কথা বলা হয়েছে। তাঁর দাবি, বর্তমান নির্মাণকাজের প্রক্রিয়া ও কারিগরি তদারকির কারণে এভাবে অনিয়ম করার সুযোগ নেই।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে জরুরি মেরামতকাজে প্রায় ৩১ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগও করা হয়। এ বিষয়ে সহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বলেন, পৌরসভার দৈনন্দিন প্রয়োজন ও জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসক বা মেয়রের অনুমোদন নিয়ে নিয়ম অনুযায়ী ক্ষুদ্র ভাউচারের মাধ্যমে এসব কাজ করা হয়। তাঁর দাবি, এ ধরনের কাজকে নিয়মিত টেন্ডারভুক্ত উন্নয়নকাজের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
পৌরসভার কর্মকর্তারা জানান, সরকারি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একাধিক পর্যায়ের কর্মকর্তা সম্পৃক্ত থাকেন। কাজের পরিমাণ ও বাস্তবায়নের হিসাব প্রথমে মাঠপর্যায়ে মেজারমেন্ট বুক (এমবি)-তে নথিভুক্ত করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী তা যাচাই-বাছাই করেন। পরবর্তী ধাপে নথি নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে যায় এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মেয়র বা প্রশাসকের কাছে উপস্থাপন করা হয়। ফলে কোনো উন্নয়নকাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট পুরো প্রক্রিয়া ও দায়িত্ব বণ্টন যাচাই করা প্রয়োজন বলে তাঁরা জানান।
অভিযোগগুলোর মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা অডিট আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা সৈয়দ শফিকুর রহমান বলেন, তিনি নতুন দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। এ ধরনের অডিট আপত্তির বিষয়ে তাঁর জানা নেই। বিষয়টি সম্পর্কে পূর্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভালো বলতে পারবেন বলে জানান তিনি।
পৌরসভার সাবেক পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা হাসান জাকিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ ধরনের অডিট আপত্তির বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, দাপ্তরিক নিয়ম অনুযায়ী অডিট আপত্তির চিঠি পৌরসভায় এলে তা হিসাব শাখায় নিবন্ধিত হওয়ার কথা।
পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম (মস্তান) বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থানীয় সরকার অডিট অধিদপ্তর থেকে যেসব অডিট আপত্তি এসেছে, সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করে জবাব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকৌশল শাখা-সংক্রান্ত যে অডিট আপত্তির কথা বলা হয়েছে, সেই চিঠি তাঁরা পাননি বলে দাবি করেন তিনি। পূর্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেও এ ধরনের চিঠির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
একই বিষয়ে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ বলেন, তিনি চলতি বছর কিশোরগঞ্জ পৌরসভায় অডিট করেছেন। তবে সংবাদে প্রকাশিত অডিট আপত্তিটি কোথা থেকে এসেছে, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই।
প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোর একটি, রূপালী বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম রাজন বলেন, “আমি অডিট আপত্তির নিউজটি আমার সহকর্মীর কাছ থেকে পেয়ে করেছি। বিস্তারিত তিনি ভালো বলতে পারবেন।”
অভিযোগের বিষয়ে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ৬১ লাখ টাকার অডিট আপত্তির কথা বলে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তাঁর দাবি, এ ধরনের কোনো অডিট আপত্তির কাগজপত্র এখন পর্যন্ত তাঁর দপ্তরে আসেনি।
এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক বা সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে অডিট আপত্তির মূল নথি, স্মারক নম্বর বা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরও স্পষ্টভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ই-পেপার
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিজানুর রহমান