
গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হলেও এই স্তম্ভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গড়ে তোলেন মফস্বল সাংবাদিকরা। দেশের প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুখ-দুঃখ, স্থানীয় সমস্যা, দুর্নীতি, অনিয়ম, সম্ভাবনা এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতার চিত্র প্রতিদিন জাতীয় গণমাধ্যমে তুলে ধরেন মাঠপর্যায়ের এসব সাংবাদিক। রাজধানী থেকে বহু দূরে অবস্থান করেও তাঁরা স্থানীয় মানুষের কথা, অধিকার ও বাস্তবতার সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন তৈরি করেন।
তবে জাতীয় পর্যায়ে সংবাদ সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও মফস্বল সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ নিজেরাই নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক, পেশাগত ও নিরাপত্তাজনিত সংকটে রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, নিয়মিত আর্থিক সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা না থাকায় তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রান্তিক পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংবাদ প্রকাশের কাজে নিয়োজিত মফস্বল সাংবাদিকদের প্রধান সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আসে।
১. তীব্র আর্থিক অনিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা
বিনা বেতনে শ্রম: অনেক জাতীয় দৈনিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম বা টেলিভিশন চ্যানেলের মফস্বল প্রতিনিধিরা নির্ধারিত বেতন বা নিয়মিত সম্মানী থেকে বঞ্চিত হন। ফলে সাংবাদিকতার পাশাপাশি তাঁদের অন্য পেশা বা আয়ের উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়।
ভাতা ও আইডি কার্ডের সীমাবদ্ধতা: কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিদের নিয়োগের পর নিয়মিত আর্থিক সহায়তার পরিবর্তে শুধু একটি প্রেস আইডি কার্ড ও পরিচয়পত্রের মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকে। আবার কোথাও কোথাও বিজ্ঞাপন সংগ্রহের সঙ্গে সাংবাদিকতার দায়িত্বকে যুক্ত করা হয়। এতে সংবাদ সংগ্রহ ও বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপনার মধ্যে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাই-লাইনের অভাব: মাঠপর্যায়ে ঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংগ্রহ করার পরও অনেক সময় জাতীয় পাতায় মফস্বল সাংবাদিকদের নাম বা বাই-লাইন প্রকাশিত হয় না। এতে তাঁদের পেশাগত স্বীকৃতি ও কাজের দৃশ্যমানতা কমে যায়।
২. প্রাণনাশের ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতা
স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপ: মফস্বল এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, চোরাচালানকারী, ভূমিদখলকারী বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থানীয় সাংবাদিকরা একই এলাকায় বসবাস ও কাজ করায় তাঁদের পরিচয় গোপন রেখে সংবাদ সংগ্রহ বা প্রকাশ করা তুলনামূলক কঠিন।
হামলা ও হুমকি: জমি দখল, দুর্নীতি, মাদক, চোরাচালান, অনিয়ম কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হুমকি, হয়রানি, শারীরিক হামলা এমনকি গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনা শুধু সাংবাদিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশকেও বাধাগ্রস্ত করে।
৩. আইনি হয়রানি ও ডিজিটাল চাপ
মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলার আশঙ্কা: স্থানীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, হুমকি কিংবা নানা ধরনের আইনি হয়রানির অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ধরনের পরিস্থিতি একজন সাংবাদিকের পেশাগত স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ডিজিটাল পরিসরে চাপ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংবাদ প্রকাশের পর মফস্বল সাংবাদিকদের অনলাইন হয়রানি, হুমকি, মানহানি ও ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও ঘটে। ডিজিটাল আইন ও বিধিবিধানের প্রয়োগ যেন সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারকে অযথা সংকুচিত না করে, সে বিষয়েও ভারসাম্যপূর্ণ ও স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
৪. প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সুরক্ষার অভাব
আধুনিক সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাই, ডেটা সাংবাদিকতা, মোবাইল জার্নালিজম, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে মফস্বল সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত।
ফেক নিউজ যাচাইয়ের সক্ষমতা: বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাই করা সাংবাদিকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা না থাকলে নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই ও দ্রুত সংবাদ প্রকাশ—দুটিই কঠিন হয়ে পড়ে।
জরুরি পরিস্থিতিতে সুরক্ষা: মহামারি, রাজনৈতিক সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে মাঠে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতিও অনেক সাংবাদিকের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
৫. অপসাংবাদিকতা ও পরিচয় সংকট
ভুয়া সাংবাদিকের দৌরাত্ম্য: মফস্বল পর্যায়ে ভুয়া সাংবাদিক বা সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের কারণে পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে পুরো পেশাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত সুরক্ষা: আর্থিক অনিশ্চয়তা, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকআপের অভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাবানদের চাপের কারণে অনেক পেশাদার সাংবাদিকও প্রত্যাশিত সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন। ফলে যোগ্য ও সৎ সাংবাদিকদের পেশায় টিকে থাকাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সংকট নিরসনে করণীয়
মফস্বল সাংবাদিকদের পেশাগত ও নিরাপত্তাজনিত সংকট কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
১. প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগ ও ন্যায্য পারিশ্রমিক: গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে মফস্বল সাংবাদিকদের যথাযথ নিয়োগপত্র, দায়িত্বের স্পষ্ট বিবরণ এবং সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
২. নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা: সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ দ্রুত তদন্ত এবং ন্যায়সংগত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকা জরুরি।
৩. প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি: প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (PIB)সহ সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত আধুনিক সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তথ্য যাচাই, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ আয়োজন করা যেতে পারে।
৪. পেশাগত স্বীকৃতি ও ডাটাবেজ: প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকদের একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ ও যাচাইযোগ্য অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকদের পেশাগত পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও কমতে পারে।
৫. সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা: সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও সম্পাদকীয় নীতিমালা সমুন্নত রাখা জরুরি। বিজ্ঞাপন সংগ্রহ বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা উচিত নয়, যাতে সংবাদিকতার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
উপসংহার
মফস্বল সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি প্রান্তিক মানুষের কথা জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা, অনিয়ম, দুর্নীতি, সম্ভাবনা ও জনদুর্ভোগের চিত্র জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে মফস্বল সাংবাদিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সাংবাদিকদের কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্ব প্রত্যাশা করার পাশাপাশি তাঁদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি। সাংবাদিকদের নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি না হলে গণমাধ্যমের জবাবদিহিতামূলক ভূমিকা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও তথ্যনির্ভর সমাজ গঠনে মফস্বল সাংবাদিকদের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা এবং তাঁদের সংকট নিরসনে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।