
আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। দিন-রাত পরিশ্রম করে তাঁদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় খড়, বাঁশ ও মাটির কাঠামো ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমায়। উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ও পালপাড়ায় এখন চলছে উৎসবের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
উপজেলার গালা, পোতাজিয়া, রূপবাটি, কৈজুরী, নরিনা ও শাহজাদপুর পৌর এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা। কেউ বাঁশ ও খড় দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি করছেন, কেউ মাটির প্রলেপ দিয়ে প্রতিমার অবয়ব ফুটিয়ে তুলছেন। আবার কেউ প্রতিমার মুখমণ্ডল ও বিভিন্ন অঙ্গের নিখুঁত আকৃতি দিতে ব্যস্ত। শেষ পর্যায়ে রঙ-তুলির আঁচড়ে প্রতিমাকে সাজিয়ে তুলছেন শিল্পীরা।
মৃৎশিল্পীরা জানান, দুর্গাপূজার কয়েক মাস আগে থেকেই প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করতে হয়। কাঠামো তৈরি, খড় বাঁধা, মাটির প্রলেপ দেওয়া, শুকানো, সূক্ষ্ম কারুকাজ, রং করা এবং সাজসজ্জা—প্রতিটি ধাপ শেষ করতে দীর্ঘ সময় ও শ্রম প্রয়োজন হয়। এবারও প্রায় দুই মাস আগে থেকে তাঁরা প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপের জন্য অর্ডার অনুযায়ী প্রতিমা তৈরি করছেন তাঁরা।
একজন মৃৎশিল্পী বলেন, এবার উপজেলায় ৪০টির বেশি মণ্ডপে তাঁদের তৈরি প্রতিমা যাবে। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, কাজের চাপও তত বাড়ছে। তাই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দিন-রাত কাজ করতে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা প্রস্তুত করে মণ্ডপে পৌঁছে দেওয়াই এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।
তবে উৎসবকে ঘিরে ব্যস্ততার পাশাপাশি মৃৎশিল্পীদের মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের শঙ্কা ও হতাশা। তাঁদের ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় মাটি, খড়, বাঁশ, রং, কাঠসহ প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। বেড়েছে শ্রমিকের মজুরিও। কিন্তু সেই তুলনায় প্রতিমার দাম বাড়েনি। ফলে অধিক শ্রম ও ব্যয়ের পরও প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছে না।
মৃৎশিল্পীরা আরও জানান, বংশপরম্পরায় তাঁরা প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত। একসময় পরিবারের প্রায় সবাই এই পেশার সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে নতুন প্রজন্মের অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করতে হয়, কিন্তু আয় তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক তরুণ এ পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প ভবিষ্যতে টিকিয়ে রাখা নিয়ে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
তাঁরা বলেন, সরকারি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মৃৎশিল্পীরা আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন। পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে এবং শিল্পীদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে নতুন প্রজন্মকেও যুক্ত করা সম্ভব হবে।
শাহজাদপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা জানান, এবার উপজেলায় প্রায় ৯০ থেকে ৯৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে অধিকাংশ মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পূজাকে সামনে রেখে মণ্ডপগুলোতে সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে।
পূজামণ্ডপগুলোতে প্রতিমা পৌঁছানোর পর শুরু হবে সাজসজ্জা ও আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির শেষ ধাপ। প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি পূজামণ্ডপগুলোতেও বাড়ছে কর্মচাঞ্চল্য। উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আনন্দ ও উৎসবের আমেজ।
মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় সাধারণ মাটি ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমায়। তাঁদের শিল্পকর্মকে ঘিরেই পূজামণ্ডপগুলোতে ফুটে উঠছে উৎসবের আবহ। শত ব্যস্ততা, বাড়তি খরচ ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন শাহজাদপুরের মৃৎশিল্পীরা।