
কক্সবাজারের চকরিয়ায় কাকারা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইসফাতুল ইসলাম জিসানকে (২৮) তুলে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। অপহরণের প্রায় চার ঘণ্টা পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কচ্ছপিয়া ঢালা এলাকা থেকে হাত-পা বাঁধা ও রক্তাক্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে চকরিয়া সদর থেকে কাকারা ইউনিয়নের লোটনী গ্রামের নিজ বাড়িতে ফেরার পথে জিসানকে তুলে নেওয়া হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। পরে সোমবার ভোরে মহাসড়কের কচ্ছপিয়া ঢালা এলাকায় তার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কাকারা সাবের সদর বাজারের (মাঝের স্টেশন) একটি দোকানের সামনে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে কয়েকজন জিসানকে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এরপর দীর্ঘ সময় তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
জিসানের বাবা নাজেম উদ্দিন নাজু ছেলেকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান তিনি।
এদিকে জিসান হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও রেকর্ডকে ঘিরে এলাকায় নতুন করে আলোচনা ও রহস্য তৈরি হয়েছে। অডিওতে জিসানের বড় ভাই কায়সারের সঙ্গে মিজান নামে এক ব্যক্তির কথোপকথন রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সেখানে জিসানকে ধরে নেওয়ার জন্য লোকজন প্রস্তুত রাখা এবং হত্যার হুমকিসদৃশ বক্তব্য শোনা যায় বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।
তবে ছড়িয়ে পড়া অডিওটির সত্যতা, এতে থাকা কণ্ঠস্বরের পরিচয় এবং এর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও যাচাইয়ের বিষয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, জিসানকে অপহরণের পর চকরিয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সবুজবাগ এলাকার ‘কবির টাওয়ারে’ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে নির্যাতন করে হত্যার পর মরদেহ কচ্ছপিয়া ঢালা এলাকায় ফেলে রাখা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মিজানের চকরিয়াস্থ বাসভবন ও সম্ভাব্য আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে মিজানকে পাওয়া না গেলেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার পরিবারের চার নারী সদস্য ও বাড়ির কেয়ারটেকারসহ মোট পাঁচজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) অহিদুর রহমান জানান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তদন্তে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে জিসান হত্যাকাণ্ডে ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে চকরিয়া উপজেলা ছাত্রদল। সংগঠনটির সভাপতি রেজাউল করিম বাপ্পি দাবি করেন, জিসান ছিলেন ছাত্রদলের একজন সক্রিয় ও উদীয়মান নেতা। তাকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করছেন।
তিনি জানান, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
জিসানকে কারা তুলে নিয়েছিল, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ কী এবং এ ঘটনায় কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত। পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওটির সত্যতা যাচাই এবং এর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।