
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সড়কে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিম্নমানের খোয়া ব্যবহারের প্রতিবাদে একাধিকবার কাজ বন্ধ করা হলেও কয়েক দিন পর একই ধরনের উপকরণ দিয়ে আবারও নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছে।
উপজেলার হারুঞ্জা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উত্তর ভাবকি গুচ্ছগ্রাম পর্যন্ত ১ হাজার ২৪৫ মিটার সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইটের খোয়া, গুঁড়া ইট, রাবিশ ও মাটিযুক্ত খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, আপত্তির পর কিছু নিম্নমানের খোয়া সরিয়ে নেওয়া হলেও পরে আবার একই ধরনের উপকরণ এনে কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে নির্মাণাধীন সড়কটির স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও এলজিইডির কর্মকর্তারা অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, নিম্নমানের কোনো উপকরণ পাওয়া গেলে তা অপসারণ করা হচ্ছে এবং প্রকল্পের কাজ নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
উপজেলা এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, হারুঞ্জা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উত্তর ভাবকি গুচ্ছগ্রাম পর্যন্ত ১ হাজার ২৪৫ মিটার সড়কটি পিচঢালাইয়ের উপযোগী করতে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। জয়পুরহাটের রাবা কনস্ট্রাকশন কাজটি বাস্তবায়ন করছে। গত বছরের মে মাসে কাজ শুরু হয় এবং চলতি বছরের মার্চে তা শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পরে আরও তিন মাস সময় বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে শ্রমিকেরা নির্মাণকাজ করছেন। রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা ইটের খোয়ার মধ্যে ভাঙা, মাটিযুক্ত ও পোড়ামাটির মতো দেখতে ইটের টুকরা রয়েছে। কোথাও কোথাও বড় আকারের ইটের টুকরাও দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রায় ৫০ মিলিমিটার বা ২ ইঞ্চি আকারের ইটের খোয়া ব্যবহারের কথা থাকলেও কোনো কোনো স্থানে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি আকারের বড় ইটের টুকরা ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব খোয়া দিয়ে সড়কের মেকাডম বা বেজ তৈরির কাজও করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের শিডিউলে মাটি ভরাট, বেড প্রস্তুত, বক্স কাটিং, এজিং, ক্যাম্বারিং, বালু ভরাট, ব্রিক ফ্ল্যাট সলিং, হেরিং বোন বন্ড ও প্যালাসাইডিংসহ বিভিন্ন কাজের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের আগে গুণগত মান পরীক্ষা করে তা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, সড়কের বেড তৈরিতে ১, ২ ও ৩ নম্বর ইটের খোয়ার পাশাপাশি গড়াই ইটও ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ইট সামান্য চাপ দিলেই গুঁড়া হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ইটের গুঁড়া ও রাবিশজাতীয় উপকরণ মেশানো হচ্ছে বলেও তাঁরা অভিযোগ করেন। এ ছাড়া সড়কের কাজে ছয় ইঞ্চি বালু দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো অংশে মাত্র এক ইঞ্চির মতো বালু দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল বলেন, “কাজের মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু অভিযোগের পরও কাজ বন্ধ হয়নি। নিম্নমানের ইটের সঙ্গে রাবিশ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রকৌশলীর উপস্থিতিতেই এসব উপকরণ দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।”
সিরাজুল ইসলাম নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, “ঠিকাদার আমাদের জানিয়েছেন, প্রকল্পের প্রাক্কলনে ৩ নম্বর ইট ব্যবহারের কথা রয়েছে। কিন্তু ৩ নম্বর ইটের পাশাপাশি গড়াই ইটও ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ইট দিয়ে কাজ করলে রাস্তা বেশি দিন টিকবে না।”
উত্তর ভাবকি গ্রামের বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, “নিম্নমানের ইট ব্যবহার না করার জন্য ঠিকাদারকে একাধিকবার বলা হয়েছে। এমনকি নিম্নমানের ইটবোঝাই একটি ট্রাক ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপরও একই ধরনের উপকরণ দিয়ে কাজ চলছে।” তিনি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা সোনিয়া আক্তার বলেন, “আমরা ৪০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। এখন পর্যন্ত কোনো রাস্তা হয়নি। এত বছর পর রাস্তা হচ্ছে, তাও কাজের মান খুব নিম্ন। ইটগুলো সব ভাঙা।”
সাইদুল ইসলাম বলেন, “এক কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের সড়কে খুবই নিম্নমানের খোয়া দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এমন নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হলে রাস্তার স্থায়িত্ব বেশি দিন থাকবে না। নির্মাণের পর দ্রুত রাস্তা নষ্ট হলে আবার জনগণের অর্থে সংস্কার করতে হবে।”
এ বিষয়ে রাবা কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী আব্দুল কাইয়ুম বলেন, “আমি কাজ পাওয়ার পর তা জাহেদ হাসানের কাছে হস্তান্তর করেছি। তিনি সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছেন। তাই কাজের ভালো-মন্দের পুরো দায় তাঁর।”
সাব-ঠিকাদার জাহেদ হাসান বলেন, “পিরোজপুর থেকে এসে এই কাজ করতে গিয়ে শুরুতে ঠকেছি। লাভের আশায় কাজ নিয়ে বিপদে পড়েছি। যেসব জায়গায় বেশি খারাপ সামগ্রী দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে খোয়া তুলে নেওয়া হবে।”
দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর বলেন, “স্থানীয়দের অভিযোগ সত্য। আমরা সবসময় চেষ্টা করছি যাতে কাজ ভালো হয়।”
উপজেলা প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর নির্বাহী প্রকৌশলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বর্তমানে সড়কের কাজ বন্ধ রয়েছে। নিম্নমানের সামগ্রী অপসারণ করে উন্নতমানের সামগ্রী ব্যবহারের জন্য ঠিকাদারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি অর্থে নির্মাণাধীন সড়কটির কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
ই-পেপার
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিজানুর রহমান