
রাজধানী ঢাকায় বসবাসরত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের অনেকে চিকিৎসা ও স্বজনদের সেবার আশায় নিজ জেলা জয়পুরহাটে ফিরছেন। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
রাজধানীর মেস কিংবা ভাড়া বাসায় একা থাকা ডেঙ্গু আক্রান্তদের অনেকেই অসুস্থ অবস্থায় পাশে স্বজন না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে বাড়ির পথে ছুটছেন। কেউ পড়াশোনার জন্য, কেউ চাকরি কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সেবা-যত্ন পাওয়ার আশায় তারা জয়পুরহাটে ফিরছেন।
জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় ও ৪০০ শয্যাবিশিষ্ট জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালের তথ্য বলছে, চলতি বছরে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা গত দুই বছরের মোট সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে চিকিৎসকদের নিবিড় নজরদারি ও চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জয়পুরহাটে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৫৩ জন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৮ জনে। তবে চলতি ২০২৬ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বেড়েছে। ১ অক্টোবরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮০ জনে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে তিনজন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন জেলা হাসপাতালে এবং একজন কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চলতি বছরে ভর্তি হওয়া ৮০ জনের মধ্যে ৭২ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আটজন রোগী চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে জেলা হাসপাতালে ছয়জন এবং পাঁচবিবি ও কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন করে রয়েছেন।
উপজেলা ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে জেলা হাসপাতালে। চলতি বছর এ হাসপাতালে ৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৯ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এছাড়া পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৪ জন, ক্ষেতলাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন, কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারজন এবং আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুরে ভর্তি হওয়া সব রোগীই ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
জেলা হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্টের শেষ পাঁচ দিনে পাঁচজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হলেও সেপ্টেম্বর মাসে হঠাৎ করে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যায়। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই হাসপাতালে ৪৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের ডেঙ্গু সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে সাত বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ৫৫ বছর বয়সী ব্যক্তিও রয়েছেন। তবে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ ও কর্মক্ষম পুরুষদের আক্রান্তের হার বেশি। জেলা হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৫৫ জনের মধ্যে ৪৬ জন পুরুষ ও নয়জন নারী।
জয়পুরহাট সদর, পাঁচবিবি, কালাই, ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুর ছাড়াও পার্শ্ববর্তী নওগাঁর ধামইরহাট, দিনাজপুরের হাকিমপুর এবং ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল এলাকার কয়েকজন রোগীও জেলা হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন।
সরেজমিনে জেলা হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু রয়েছে। পুরুষ রোগীদের জন্য এক নম্বর ভবনের নিচতলার ১০ নম্বর ওয়ার্ড এবং নারী রোগীদের জন্য একই ভবনের চতুর্থ তলার ১৪ নম্বর ওয়ার্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রতিটি শয্যায় মশারি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্সদের রোস্টার অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, জেলার চারটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড চালু রয়েছে।
দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী লিয়ন আহম্মেদ (১৯) পড়াশোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার ধানমন্ডিতে বসবাস করেন। হঠাৎ তার শরীরে তীব্র জ্বর ও দুর্বলতা দেখা দেয়। নাপা সেবনের পর কিছু সময়ের জন্য জ্বর কমলেও আবার তা বেড়ে ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে উঠে যায়।
প্রথমে তিনি ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। ওষুধ সেবনের পরও জ্বর না কমায় রাজধানীর একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করান। তবে সেখানে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসে।
ঢাকায় দেখাশোনার মতো স্বজন না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আওড়া গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন লিয়ন। পরে গত ২৯ সেপ্টেম্বর তাকে জয়পুরহাট জেলা হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেখানে পুনরায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা করা হলে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। বর্তমানে চিকিৎসকদের নিবিড় সেবায় তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
লিয়ন আহম্মেদ বলেন, “প্রথমে শরীরে প্রচণ্ড জ্বর ছিল। নাপা খেলে কিছু সময় জ্বর কমে, পরে আবার বেড়ে যায়। ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত জ্বর উঠত। খুব কষ্ট হতো। ঢাকায় দেখাশোনা করার মতো কেউ না থাকায় বাড়িতে চলে আসি। পরে জয়পুরহাট হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছি। জ্বর উঠলে খুব কষ্ট হয়। আবার জ্বর নেমে গেলে অস্বস্তি লাগে। মাঝে মাঝে বমি বমি ভাব হয় এবং শরীর একেবারে নিস্তেজ হয়ে যায়।”
এদিকে জেলা হাসপাতালের নারী ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন ঢাকার শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার পোশাকশ্রমিক আঁখি আকতার (২২)। তার বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলায়। তিনি আশুলিয়ার জিরানীবাজার এলাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন।