
“শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশা সুরক্ষা, এর মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠনে ৬০ বছর”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চাঁদপুরের হাইমচরে বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সকাল ১০টায় উপজেলা শিক্ষা পরিবারের আয়োজনে র্যালিটি উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে শুরু হয়ে দুর্গাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে শেষ হয়। পরে কলেজের অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বাজাপ্তি রমনী মোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান শিকদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ইউএনও মো. নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “বাবা-মায়ের পর একজন শিক্ষকের স্থান। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় জন্মদাতার মতো। তাই প্রত্যেক শিক্ষককে বাবা-মায়ের মতো দায়িত্বশীল ও আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে হবে।”
তিনি শিক্ষকদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো শিক্ষক যেন অন্য শিক্ষকের বিরুদ্ধে গিবত বা নেতিবাচক আলোচনা না করেন। নিজেদের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদেরও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষকদের গ্রেডসহ বিভিন্ন বিষয়েও তিনি কথা বলেন। জমি খারিজের বিষয়ে ইউএনও বলেন, সরকারি নির্ধারিত ফি-এর অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কেউ জমি খারিজ করবেন না। কেউ অতিরিক্ত অর্থ দাবি বা গ্রহণ করলে বিষয়টি প্রশাসনকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
ইউএনও আরও জানান, আগামী ১০ অক্টোবর শনিবার সকাল ১০টায় দুর্গাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ অডিটোরিয়ামে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক উপস্থিত হয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ে সেমিনারে অংশ নেবেন। এতে হাইমচরের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, প্রিন্সিপাল, প্রধান শিক্ষক এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতিদের উপস্থিত থাকার জন্য তিনি অনুরোধ জানান।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম শফিক বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে পাশের হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমরা অনেকটা সফল হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতার হার কতটা বাড়াতে পেরেছি—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের সামনে শিক্ষার্থীরা ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার মতো ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শিক্ষকদের শুধু পাঠদান করলেই হবে না; নিজেদের আদর্শ আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক সমাজের চাকরি জাতীয়করণসহ যৌক্তিক দাবিগুলোর প্রতিও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কামাল বলেন, একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না; তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তা, আচরণ ও ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, প্রাথমিক শিক্ষাই একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি। এ পর্যায়ে শিক্ষকদের আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও সঠিক দিকনির্দেশনা শিশুর ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি শিশুদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে।
উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. হারুন অর রশিদ গাজী বলেন, জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। একজন আদর্শ শিক্ষক একটি বিদ্যালয়, একটি প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ সমাজকে পরিবর্তন করতে পারেন। তাই শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও পালন করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণের দাবির প্রতিও তিনি সমর্থন জানান।
গন্ডামারা ফাজিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আবদুর রহমান হামিদি বলেন, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ছাড়া প্রকৃত শিক্ষা পূর্ণতা পায় না। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সত্যবাদিতা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষকরা নিজেদের আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে আদর্শ স্থাপন করবেন—এটাই হওয়া উচিত বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার।
আদর্শ শিশু নিকেতনের প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ বলেন, একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু শিক্ষক নয়, অভিভাবকের ভূমিকাও পালন করতে হয়। শিশুদের মেধা বিকাশের পাশাপাশি তাদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশের দিকেও নজর দিতে হবে। বিদ্যালয়কে আনন্দময় ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, হাইমচর উপজেলা শাখার সভাপতি শেখ আবু জাফর বলেন, প্রাথমিক শিক্ষকরাই শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি করেন। শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা ও যৌক্তিক দাবির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, হাইমচর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. নাছির উদ্দীন বলেন, শিক্ষকদের মর্যাদা ও দায়িত্ব—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে শিক্ষকরা যে দায়িত্ব পালন করছেন, তার যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। তিনি শিক্ষকদের ঐক্য, পেশাগত দায়িত্বশীলতা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
আলোচনা সভায় বক্তারা শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা, পেশাগত দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা প্রদান এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সারা দেশের ন্যায় হাইমচরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নিজ নিজ উদ্যোগে বিশ্ব শিক্ষক দিবস যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয়েছে।