
বান্দরবানের লামা উপজেলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে সরকারি খাদ্যশস্য বরাদ্দের তালিকা প্রণয়ন নিয়ে অনিয়ম ও বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। বিগত বছরগুলোতে বরাদ্দ পাওয়া পাঁচটি বৌদ্ধ বিহারের নাম চলতি বছরের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক উঃ নন্দমালা থের। একই সঙ্গে নতুন করে আটটি ক্রামা বিহারের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
এ ঘটনায় গত ১৫ অক্টোবর লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারী বাদ পড়া বিহারগুলোর নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তি, বরাদ্দের তালিকা যাচাই এবং সরকারি সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
বাদ পড়েছে পাঁচটি বৌদ্ধ বিহার
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিগত বছরগুলোতে লামা উপজেলায় প্রবারণা পূর্ণিমার ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ৭৯টি বৌদ্ধ বিহার সরকারি খাদ্যশস্য বরাদ্দ পেত। তবে চলতি বছরের তালিকা থেকে পাঁচটি বিহারের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাদ পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—
১. ইয়াংছা বড় পাড়া বৌদ্ধ বিহার
২. ইয়াংছা হেডম্যান পাড়া বৌদ্ধ বিহার
৩. ইয়াংছা নামা পাড়া বৌদ্ধ বিহার
৪. কৃপাশরণ ও নন্দমালা বৌদ্ধ বিহার
৫. জীনামেজু অনাথ আশ্রম বৌদ্ধ বিহার।
অন্যদিকে, নতুন করে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আটটি প্রতিষ্ঠান হলো—
১. লুলাইং নয়া পাড়া ক্রামা বিহার
২. নয়া আলক পাড়া ক্রামা বিহার
৩. আলক পাড়া ক্রামা বিহার
৪. ময়ূর পাড়া ক্রামা বিহার
৫. চংকক পাড়া ক্রামা বিহার
৬. ডলা পাড়া ক্রামা বিহার
৭. বোচা পাড়া ক্রামা বিহার
৮. মংয়াং পাড়া ক্রামা বিহার।
বরাদ্দের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন নন্দমালা থেরের
পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক উঃ নন্দমালা থেরের দাবি, প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। তাই এ উৎসব উপলক্ষে সরকারি খাদ্যশস্য বরাদ্দের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বৌদ্ধ বিহারগুলোর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠানকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হলে তা যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে পৃথক তালিকা ও স্বতন্ত্র বরাদ্দের আওতায় করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বাদ পড়া পাঁচটি বৌদ্ধ বিহারের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান তিনি।
বরাদ্দের তালিকায় প্রতিটি বিহারের পরিচালনা কমিটির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের নাম, মোবাইল নম্বর ও পূর্ণ ঠিকানা উল্লেখ করার প্রস্তাবও দিয়েছেন নন্দমালা থের। তাঁর মতে, তালিকা তৈরির পর উপজেলা ত্রাণ শাখা অথবা সংশ্লিষ্ট বিভাগের মাধ্যমে সরেজমিন তদন্ত করে খাদ্যশস্য বিতরণ করা হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে যোগাযোগের জন্য পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদের কেন্দ্রীয়ভাবে অনুমোদিত লামা উপজেলার ছাগলখাইয়া বৌদ্ধ বিহারের অস্থায়ী কার্যালয়ের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
আগের বরাদ্দের তালিকা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের আমলেও প্রবারণা পূর্ণিমা ও সাংগ্রাই উৎসবের সরকারি বরাদ্দের তালিকা প্রণয়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ছিল। তাঁর দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট ঠিকানা ছাড়াই তালিকা তৈরি ও বরাদ্দ বিতরণ করা হতো।
এবারও একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণের আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যাচাই-বাছাইয়ের পর তালিকা পাঠানোর আহ্বান সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের
লামা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা থোয়াইনু অং চৌধুরী বলেন, ধর্মীয় কিংবা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নাম সরকারি বরাদ্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, নির্ধারিত ছক অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর ত্রাণ শাখার মাধ্যমে তদন্ত ও যাচাই শেষে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো উচিত।
জীনামেজু অনাথ আশ্রম বৌদ্ধ বিহারের মতো একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার বিষয়টিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বিতর্কিত তালিকাটি পুনরায় যাচাই এবং বাদ পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান।
তালিকা পাঠানোর বিষয়ে ত্রাণ শাখা ও ইউনিয়ন পরিষদের বক্তব্য
বরাদ্দের তালিকা কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা জানতে চাইলে লামা উপজেলা ত্রাণ শাখা জানায়, প্রায় তিন মাস আগে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য ও সচিবদের দেওয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তালিকাই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তালিকা নিয়ে অভিযোগ থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে বলে জানানো হয়।
অন্যদিকে, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের পাঁচটি বৌদ্ধ বিহারের নাম বাদ পড়ার কারণ জানতে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুহুল আমিন খন্দকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, স্থানীয় ইউপি সদস্যদের জমা দেওয়া তালিকা অনুযায়ী তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা আগে থেকেই ইউনিয়ন পরিষদে জমা ছিল। ফলে তালিকা প্রণয়নের সময় কেন প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম বাদ পড়ল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় তালিকা প্রস্তুত, যাচাই ও অনুমোদনের প্রতিটি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।
ইয়াংছা এলাকায় ক্ষোভ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
পাঁচটি বৌদ্ধ বিহারের নাম বাদ পড়ার ঘটনায় ইয়াংছা এলাকার স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি বরাদ্দ ও উন্নয়ন কার্যক্রমে ইয়াংছা এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলো বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের অন্যান্য এলাকার মতো ইয়াংছার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাবে কি না।
তাঁরা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বাদ পড়ার কারণ প্রকাশ এবং সরকারি বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগ পেয়েছে প্রশাসন, যাচাই করে সিদ্ধান্তের আশ্বাস
এ বিষয়ে লামা উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত আলীকদমের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি অভিযোগ আকারে তাঁর কাছে এসেছে। বিগত বছরগুলোর বরাদ্দের তালিকা যাচাই করে জেলা প্রশাসককে জানানো হবে। জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
স্বচ্ছ তদন্তের অপেক্ষায় সংশ্লিষ্টরা
প্রবারণা পূর্ণিমার সরকারি খাদ্যশস্য বরাদ্দের তালিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বিগত বছরের তালিকা, চলতি বছরের প্রস্তাবিত তালিকা, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের নথি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব ও কার্যক্রম যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বাদ পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অভিযোগকারী, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ত্রাণ শাখা ও প্রশাসনের বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
সরকারি বরাদ্দের উদ্দেশ্য যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং যোগ্য কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যাতে অযৌক্তিকভাবে সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য দ্রুত ও নিরপেক্ষ যাচাইয়ের প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা। প্রশাসনিক তদন্তের পরই এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।