
মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন শিশু-নারী-বৃদ্ধ; জনবল সংকট ও জরাজীর্ণ ভবনে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা, ১০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি
বান্দরবানের লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ৮৭ জন রোগী। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে না পেরে শিশু, নারী ও বয়স্ক রোগীদের অনেককেই মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে জরুরি বিভাগের ছাদে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং হাসপাতালের নিচতলার ছাদ থেকেও পানি পড়ছে। পাশাপাশি দুই বছরের বেশি সময় ধরে অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ থাকায় গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন স্বজনরা।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, নির্ধারিত শয্যার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। শয্যার সংকটের কারণে একই কক্ষে অতিরিক্ত রোগী থাকায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদেরও বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ছাদে ফাটল এবং নিচতলার ছাদ থেকে পানি পড়ার বিষয়টি নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, রোগীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত ভবনটি সংস্কার করা প্রয়োজন।
লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সোলাইমান আহমেদ বলেন, রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় বেডিং, চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ সরবরাহসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগী বেশি থাকায় সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, “৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের জনবল কাঠামো অনুযায়ী আমরা নিয়োগ পেয়েছি। বর্তমানে হাসপাতালটি ৫০ শয্যার হলেও সে অনুযায়ী জনবল বাড়ানো হয়নি। সীমিত জনবল দিয়ে অনেক কষ্টে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীর পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ না হওয়ায় বিদ্যমান জনবলের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় দ্রুত জনবল বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
হাসপাতালটির অন্যতম বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ থাকা। দুই বছরের বেশি সময় ধরে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না চলায় গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্বজনদের।
বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার রোগীদের জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে বেসরকারি যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
লামা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম মোস্তফা নাদিম বলেন, “স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি প্রেরণ করে যাচ্ছি, কোনো ফলাফল পাচ্ছি না।”
তিনি জানান, হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার জানানো হয়েছে। তবে এখনো সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় চিকিৎসাসেবা পরিচালনায় নানা সংকট রয়ে গেছে।
স্থানীয়দের মতে, লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি শুধু লামা উপজেলার মানুষের নয়, আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষেরও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। রোগীর চাপ বিবেচনায় হাসপাতালটি ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহ, চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা অ্যাম্বুলেন্স সেবা দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের প্রত্যাশা, দুর্গম পাহাড়ি জনপদের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।