
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার খলিসাগাড়িতে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো দেবালয় জমিদার বাড়ি। দীর্ঘ সময়ের নানা পরিবর্তনের মধ্যেও জমিদার পরিবারের স্মৃতি, পারিবারিক পূজা-পার্বণ, প্রাচীন স্থাপনা ও ঐতিহ্যবাহী মেলা আজও এ বাড়ির ইতিহাসকে বহন করে চলেছে।
স্থানীয় ইতিহাস ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় চারশ বছর আগে খলিসাগাড়ি স্টেটের জমিদার ছিলেন কৃষ্ণ কান্ত দেব। তার ছেলে নীল মাধব দেব। নীল মাধব দেবের দুই সন্তান ইন্দু মাধব দেব ও সুধাংশু দেব। এই বংশের উত্তরসূরিদের হাত ধরেই দেবালয় জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে আছে।
ইন্দু মাধব দেবের এক পুত্রবধূ ছিলেন গৌরী রানী দেব। পারিবারিক সূত্রে তিনি নীল মাধব দেবের নাতবউ। বর্তমানে এই বাড়িতে বসবাস করছেন গৌরী রানী দেব। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি জমিদার বাড়ির পারিবারিক ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
দেবালয় জমিদার বাড়ির অন্যতম আকর্ষণ তাদের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা। সাধারণত মহালয়া থেকে ষষ্ঠী কিংবা ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত দুর্গাপূজার আয়োজনের কথা শোনা গেলেও এই জমিদার বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যতিক্রমীভাবে টানা দশ দিন দুর্গাপূজা পালনের ঐতিহ্য রয়েছে।
মহালয়ার পর প্রতিপদ, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী—এভাবে ধারাবাহিকভাবে পূজার আয়োজন করা হয়। জমিদার কৃষ্ণ কান্ত দেব নিজ বাড়িতেই পূজা করতেন। সেই পারিবারিক ধারাবাহিকতা এখনো বংশধররা ধরে রেখেছেন।
জানা যায়, দীর্ঘ সময় সংস্কারের অভাবে পুরোনো মন্দিরটির অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে জমিদার পরিবারের পুত্রবধূ গৌরী রানী দেবের উদ্যোগে প্রায় ১১৮ বছর পর মন্দিরটি পুনরায় সংস্কার করা হয়। এর মাধ্যমে পুরোনো স্থাপনা ও পারিবারিক ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দেবালয় জমিদার বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি ঐতিহ্যবাহী মেলা। জমিদারি আমলে বিজয়া দশমীর দিন জমিদার বাড়ির সামনের বিশাল খোলা মাঠে বসত জমজমাট মেলা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এ মেলায় আসতেন।
মেলায় পাওয়া যেত মুড়ি, মুড়কি, বাতাসা, খাগড়াই, দই, চিড়া, গোল্লাসহ নানা ধরনের খাবার ও মাটির তৈরি তৈজসপত্র। শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা।
চারশ বছরের পুরোনো সেই মেলার ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। ক্ষেতলালের খলিসাগাড়িতে, হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় প্রতি বছর বিজয়া দশমী উপলক্ষে এ মেলা বসে। বর্তমানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এ মেলায় অংশ নেন।
জানা যায়, জমিদারি আমলে বিজয়া দশমীর দিন জমিদার পরিবারের পক্ষ থেকে আগত মানুষের জন্য খাবারেরও ব্যবস্থা করা হতো। জমিদার পরিবারের উদারতা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের স্মৃতি স্থানীয় মানুষের কাছে এখনো আলোচিত।
কৃষ্ণ কান্ত দেবের পরবর্তী বংশধররাও পিতার মতো উদার ও জনহিতৈষী ছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। তাদের মধ্যে রাধা চরণ দেব, হারাধন দেব ও সুধাংশু দেব নিজ নিজ ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেন।
স্থানীয়দের মতে, শুধু ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড নয়, এলাকার জনকল্যাণেও জমিদার পরিবারের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ক্ষেতলাল উপজেলা প্রশাসনের বর্তমান বিভিন্ন সরকারি কার্যালয় যে এলাকায় স্থাপিত হয়েছে, সেই ভূমির একটি অংশ খলিসাগাড়ি স্টেটের পক্ষ থেকে দান করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
চারশ বছরের পুরোনো দেবালয় জমিদার বাড়ি তাই শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি ক্ষেতলালের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন। সময়ের পরিবর্তনে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও পুরোনো এই বাড়ি, মন্দির, দুর্গাপূজা ও ঐতিহ্যবাহী মেলা আজও বহন করে চলেছে অতীতের সেই গৌরবময় ইতিহাস।