রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
মেলান্দহে ৮৩ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার বিএনপি নেতা বহিষ্কার মানিকগঞ্জে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত সন্দেহে ২ হাজার ছাড়াল রোগী, হাম শনাক্ত ৪৭ জনের জয়পুরহাটের দুর্গাদহ কলার হাটে কোটি টাকার বাণিজ্য, ভোগান্তিতে কৃষক-ব্যবসায়ীরা লালমনিরহাট সীমান্তে ১২ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ব্যর্থ বিএসএফ পাঁচবিবিতে পুকুর সেচ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু লালপুরে অনলাইন জুয়া ও বেটিং পরিচালনার অভিযোগে যুবক আটক, দুটি মোবাইল জব্দ কালাইয়ে ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকার সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ, নিম্নমানের সামগ্রী সরালেন ঠিকাদার লালমনিরহাটে কুমড়ীরহাট-গোড়ল সড়কের উন্নয়নকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হাইমচরে মাসিক উন্নয়ন সভা অনুষ্ঠিত, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে কৃতিত্বের জন্য গ্রাম পুলিশকে পুরস্কৃত হাইমচরে ৬ ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান-মেম্বার প্রার্থীদের সঙ্গে এমপি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের মতবিনিময়

ভিউয়ের নেশায় গুজবের আগুন, সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন

mijanur rohman
রিপন মিয়া, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) / বার্তা পাঠানো হয়েছে
রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬
  • রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

সিংগাইরের তিন ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি, বিব্রত পুলিশ ও মূলধারার সাংবাদিকেরা

মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ, এরপর যাচাই-বাছাই ছাড়াই ফেসবুক ও ইউটিউবে প্রচার। কখনো যৌন সহিংসতার শিকার নারীর পরিচয় প্রকাশ, কখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা, আবার কখনো মৃত্যুর ঘটনাকে নিশ্চিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন। এমন সব কনটেন্ট ঘিরে ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি, তৈরি হচ্ছে উত্তেজনা। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবার, পুলিশ ও মূলধারার সাংবাদিকদের।

মানিকগঞ্জের সিংগাইরে সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে—ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় কি হারিয়ে যাচ্ছে সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা? তথ্য যাচাই, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের পরিবর্তে কিছু কনটেন্ট নির্মাতার বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রচারের অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশের অভিযোগ

সিংগাইরে ২৩ বছর বয়সী এক নারীকে গণধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের সবাই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এ ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে, কয়েকজন ইউটিউবার ও কনটেন্ট নির্মাতা ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করে ভিডিও প্রচার করেছেন। তাঁর আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সাক্ষাৎকারও পরিচয় শনাক্ত করা যায়—এমনভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে পরিবারটি সামাজিক ও পারিবারিক সংকটে পড়েছে। সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ তাঁর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ধরনের ঘটনায় সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।

চিকিৎসাধীন যুবককে মৃত ঘোষণার অভিযোগ

সিংগাইরের ধল্লা ইউনিয়নে শহিদুল ইসলাম (২২) নামের এক যুবককে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়েছে। এজাহার অনুযায়ী, গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে পূর্ববিরোধের জেরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।

অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় কয়েকজন কনটেন্ট নির্মাতা তাঁকে মৃত ঘোষণা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর প্রচার করেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর স্বজনেরা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাল্টা মামলাও হয়েছে বলে জানা গেছে।

একটি অসমর্থিত তথ্য কীভাবে মানুষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে এবং তা থেকে নতুন করে সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, এ ঘটনা সে প্রশ্ন সামনে এনেছে।

মারিয়ার মৃত্যু ঘিরে ছড়ায় নানা দাবি

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি সিংগাইরের সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়া মাহির (১৪) মৃত্যুকে ঘিরে। এ ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা দাবি ও তথ্যের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত ১৫ জুন বিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় মারিয়া। ছয় দিন পর, ২১ জুন চন্দননগর এলাকার একটি কবরস্থানসংলগ্ন ঝোপে গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তার মা হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় শিক্ষক, সংবাদকর্মী ও শিক্ষার্থীসহ মোট নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন কনটেন্টে মারিয়ার মৃত্যুকে নিশ্চিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপনের পাশাপাশি মরদেহে অ্যাসিড নিক্ষেপ ও গোপনাঙ্গে রড ঢোকানোর মতো গুরুতর ও নৃশংস ঘটনার দাবিও প্রচার করা হয়েছিল। তবে এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে, ময়নাতদন্তের ফলাফলের বরাতে আত্মহত্যার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলামও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথা উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন। তবে মারিয়ার পরিবার শুরু থেকেই হত্যার অভিযোগ করে আসছে। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্তের নথি, চিকিৎসা-আইনগত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা জরুরি। মামলার আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এবং অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

সাংবাদিকতার নামে অপতথ্য প্রচার নিয়ে উদ্বেগ

সিংগাইর প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. সোহরাব হোসেন বলেন, মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করলেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যান না। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা জরুরি।

তিনি অভিযোগ করেন, কিছু কনটেন্ট নির্মাতা রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছেন। অথচ তাঁদের প্রকাশিত যাচাইহীন ভিডিও ও পোস্টের কারণে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, যা মূলধারার সাংবাদিকদেরও বিব্রত করছে।

তাঁর মতে, ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় যাচাইহীন তথ্য প্রচার, ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ এবং একপক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা বাড়াতে পারে। তাই সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া অপরিহার্য।

পুলিশও বিব্রত

এ বিষয়ে সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “এরা অপসাংবাদিকতা করে থাকে। ভিউ বাড়ানোর জন্য এমন জঘন্য কাজ করেছে। এরা মোটেও সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা জানেন না।”

বিশেষ করে সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারিয়া মাহির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন তথ্য নিয়ে পুলিশ বিব্রত হয়েছে বলে জানান তিনি। সিংগাইরের তিনটি ঘটনা ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান ওসি।

দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা কেন জরুরি

সিংগাইরের ঘটনাগুলো তথ্য যাচাই, সংবাদ প্রকাশের নৈতিকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় একটি ভুল তথ্যও ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। এমনকি জনমনে আতঙ্ক, সামাজিক সংঘাত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও ঘটতে পারে।

তাই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশের আগে তার সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, নির্ভরযোগ্য সূত্রের ওপর নির্ভরতা এবং ভুক্তভোগীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। কারণ, সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য শুধু দর্শক বা পাঠক বাড়ানো নয়; বরং সত্যনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরে জনগণকে সচেতন করা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করা।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত II দৈনিক জনতার দেশকন্ঠ II আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ। জিমেইল : janatardeshkhantho@gmail.com
Theme Customized By BreakingNews