
জয়পুরহাটে ফেলে দেওয়া হাঁসের পালক প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করা হচ্ছে চীন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। একসময় মূল্যহীন বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া এসব পালক এখন হয়ে উঠেছে বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাময় পণ্য। আর এই উদ্যোগে কর্মসংস্থান হয়েছে দরিদ্র ও অসহায় নারীদের পাশাপাশি বেকার যুবকদের।
জেলার আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর বাজারে ‘সারাবাংলা ডাউন প্রোডাক্ট’ নামের একটি কারখানায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা হাঁসের পালক বাছাই, শুকানো ও আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। পরে এসব পালক বিদেশে রপ্তানি করা হয়। সেখানে পালক দিয়ে তৈরি হচ্ছে জ্যাকেট, কম্বল, চাদর, বালিশ, জাহাজের সোফা ও ব্যাডমিন্টনের ফেদারের ককসহ বিভিন্ন পণ্য।
কারখানাসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিমাসে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ২৫ থেকে ৩০ টন হাঁসের পালক সংগ্রহ করা হয়। এসব পালক প্রথমে রোদে শুকানো হয়। পরে বাছাই ও কয়েক ধাপের প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হয়। বর্তমানে কারখানাটিতে ১৬ জন শ্রমিক কাজ করছেন।
উদ্যোক্তা আলতাব হোসেনের হাত ধরে এ উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়। শেরপুর জেলার বাসিন্দা আলতাব ২০১৪ সালে ছোট পরিসরে হাঁসের পালক নিয়ে কাজ শুরু করেন। তবে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার অভাবে তখন সফল হতে পারেননি। পরে ২০১৫ সালে চীনে গিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং একটি প্রতিষ্ঠানে এক বছর পালক প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ শেখেন। ২০২২ সালে চীন থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে দেশে ফিরে জয়পুরহাটের তিলকপুরে কারখানা স্থাপন করেন। এতে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন বলে জানান তিনি।
আলতাব হোসেন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল ব্যবসা করব। চীনে পড়াশোনা শেষ করে পালক প্রক্রিয়াজাতকরণের অভিজ্ঞতা অর্জন করি। এরপর দেশে ফিরে কারখানা চালু করি। বর্তমানে চীন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও ভারতে পালক রপ্তানি করছি। যেসব দেশে শীত বেশি, সেখানে এসব পালকের চাহিদা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশেই যদি হাঁসের পালক থেকে জ্যাকেট, কম্বল, বালিশসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা যায়, তাহলে রপ্তানি আয় আরও বাড়ানো সম্ভব। তবে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ১৫ কোটি টাকা প্রয়োজন। সরকার সহযোগিতা করলে কিংবা স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করলে দেশে এসব পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।’
কারখানাটিতে কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন স্থানীয় নারীরাও। শ্রমিক মীম খাতুন বলেন, ‘পালক সংগ্রহের পর রোদে শুকিয়ে বস্তায় ভরে কারখানায় পাঠাই। এখান থেকে যে টাকা পাই, তা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ বহন করি।’
সামেনা বেগম বলেন, ‘আমার পরিবারে আটজন সদস্য। আট বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হতো। পরে এই কারখানায় কাজ পাই। প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা বেতন পাই। ওভারটাইম করলে আরও বেশি আয় হয়। এখন পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারছি।’
কারখানার ব্যবস্থাপক সোহেল রানা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা পালক প্রথমে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর মেশিনে কয়েক ধাপে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ছোট পালক দিয়ে জ্যাকেট, কম্বল, চাদর, বালিশ ও জাহাজের সোফার উপকরণ তৈরি করা হয়। আর উপযুক্ত পালক দিয়ে ব্যাডমিন্টনের কক তৈরি করা হয়। এসব পালক বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ট্রেনিং অফিসার কল্পনা রানী রায় বলেন, ‘একসময় ফেলে দেওয়া হাঁসের পালক এখন সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়েছে। আমরা কারখানাটি পরিদর্শন করেছি এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছি। তাদের বিভিন্ন কারিগরি পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দেশে পালক থেকে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ সরকারি সহযোগিতা, সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে হাঁসের পালকভিত্তিক এই শিল্প দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের পথও আরও প্রসারিত হবে।