
জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ করতে গিয়ে প্রায় দুই যুগের পুরোনো ২৪টি মেহগনি গাছ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নির্মাণকাজের সুবিধার্থে গাছের গোড়া থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থী ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এরই মধ্যে একটি গাছ ভেঙে পড়েছে। বাকি গাছগুলো রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
কলেজের জমি সুরক্ষিত করতে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ৪৪৯ মিটার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে জামালপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। গত সপ্তাহে শুরু হওয়া এ কাজ নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, কলেজের যেসব এলাকায় জমি দখলের আশঙ্কা রয়েছে, সেসব স্থানকে গুরুত্ব না দিয়ে মূল প্রবেশপথের পাশের রাস্তা ও পুকুরঘেঁষা এলাকায় প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পুরোনো গাছগুলোও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ ঐতিহ্য, বিস্তৃত ক্যাম্পাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন সীমানাপ্রাচীর না থাকায় কলেজের জমি বিভিন্ন সময়ে দখল হয়েছে। এ অবস্থায় কলেজের সম্পত্তি রক্ষায় প্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
দরপত্রের মাধ্যমে নির্মাণকাজটি ঢাকার মেসার্স এম এ ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। তবে কাজটি বাস্তবে পরিচালনা করছেন জামালপুর জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আব্দুল হালিম বলে জানা গেছে।
গত ৮ অক্টোবর একটি মেহগনি গাছ ভেঙে পড়ার পর বাকি গাছগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। নির্মাণকাজে নিয়োজিত হেডমিস্ত্রি দাবি করেছেন, পুকুরে চাষ করা ‘গাছ কার্প’ মাছ গাছের গোড়ার মাটি খেয়ে ফেলায় গাছটি পড়ে গেছে। তবে এ ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থী ও পরিবেশকর্মীরা।
কাজটি পরিচালনাকারী আব্দুল হালিম বলেন, গাছের কোনো ক্ষতি হয়নি। যেসব গাছের গোড়া থেকে মাটি সরে গিয়েছিল, সেগুলো বাঁশ দিয়ে ঠেকা দেওয়া হয়েছে।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন জামালপুর জেলা শাখার সভাপতি ও সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের শিক্ষার্থী আল আমিন রুহানি বলেন, কলেজের অনেক জমি দখল হয়ে যাচ্ছে, অথচ সেদিকে যথাযথ নজর দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর মতে, দখলের আশঙ্কা রয়েছে এমন এলাকায় প্রাচীর নির্মাণ করা হলে কলেজের জমি রক্ষার পাশাপাশি গাছগুলোও বাঁচানো সম্ভব হতো। তিনি কলেজের পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

////জেলা প্রতিনিধি জমালপুর ///
জামালপুর জেলা পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী বলেন, পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো উন্নয়নকাজ করা উচিত নয়। যেসব গাছ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যেগুলো এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আব্দুল বার্সেদ বলেন, তিনি গত মাসে কলেজে যোগ দিয়েছেন। সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ প্রকল্পটি তাঁর যোগদানের আগেই নেওয়া হয়েছিল। গাছের বিষয়ে ঠিকাদার ও প্রকৌশলীকে সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু তাঁকে না জানিয়েই কাজ শুরু করা হয়েছে বলে জানান তিনি। একটি গাছ ভেঙে পড়ায় কলেজের বিদ্যুৎ লাইনে সমস্যা হয়েছিল এবং এক দিন একটি ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ ছিল বলেও জানান অধ্যক্ষ। বাকি গাছগুলো নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জামালপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়িতা অধিকারী বলেন, কলেজ কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী নির্ধারিত স্থানগুলোতে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজের সময় বৃষ্টি হচ্ছিল এবং অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে একটি গাছ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো গাছের ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থেকে বাকি নির্মাণকাজ পরিচালনা করা হবে।
কলেজের জমি সুরক্ষায় সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশ ও গাছপালা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, পরিকল্পিতভাবে কাজ পরিচালনা এবং ঝুঁকিতে থাকা গাছগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হলে উন্নয়নকাজের পাশাপাশি কলেজের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব।