
সার্টিফিকেট নেওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ তিন কিশোরী; সম্পর্কের সূত্রসহ একাধিক দিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ, থানায় জিডি করেছেন অভিভাবকেরা”
বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা-বধুরঝিরি এলাকার তিন কিশোরী গত ১০ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ রয়েছে। মানিকপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট নেওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। ইয়াংছা বাজার থেকে টমটমে করে চকরিয়ার দিকে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও এরপর তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় নিখোঁজ কিশোরীদের পরিবারের সদস্যরা লামা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে জানা গেছে। মেয়েদের সন্ধান পেতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করে আকুল আবেদন জানিয়েছেন অভিভাবকেরা। অন্যদিকে, নিখোঁজের কারণ উদ্ঘাটন ও তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
নিখোঁজ তিন কিশোরী কারা?
নিখোঁজ তিন কিশোরী হলো—
১. রেশমি আক্তার (১৭): বাবা শহিদুল ইসলাম, মা রোজিনা আক্তার। বাড়ি ইয়াংছার বনফুর এলাকার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে।
২. তানিয়া সুলতানা (১৩): বাবা আবুল হাশেম, মা কুলছুমা বেগম। বাড়ি ইয়াংছা-বধুরঝিরি মুসলিম পাড়ায়। সে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
৩. হালিমাতুচ্ছ সাদিয়া (১৪): বাবা বেলাল উদ্দিন, মা শারমিন আক্তার। বাড়ি ইয়াংছা-বধুরঝিরি পাড়ায়।
সার্টিফিকেট নেওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় তিনজন;
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ অক্টোবর মানিকপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট নেওয়ার কথা বলে তিন কিশোরী একসঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়। রেশমি ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। তার সার্টিফিকেট নেওয়ার কথা বলেই অন্য দুই কিশোরী তার সঙ্গে বের হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তাদের কয়েকজন সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠজন।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তারা ইয়াংছা বাজারে আসে। সেখান থেকে টমটমে করে চকরিয়ার উদ্দেশে রওনা হয় বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট গাড়িচালক তাদের চকরিয়া যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
তবে চকরিয়ায় পৌঁছানোর পর তারা কোথায় গেছে, কারও সঙ্গে দেখা করেছে কি না কিংবা বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছে—এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তারা স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছে, নাকি অন্য কোনো কারণে নিখোঁজ হয়েছে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সম্পর্কের সূত্র ধরে তদন্ত, সামনে এসেছে আরও কিছু তথ্য;
রেশমির কয়েকজন সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠজনের দাবি, চট্টগ্রামের এক ছেলের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। বিষয়টি জানার পর রেশমির মামা জাহাঙ্গীর ওই ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে রেশমির বিষয়ে জানতে চান। তবে ছেলেটি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কুমারী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জামিল আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক অনুসন্ধানে সম্পর্কজনিত কোনো বিষয় জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রেশমির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বলে জানা এক ছেলের সঙ্গেও পুলিশ কথা বলেছে। পাশাপাশি অন্য দুই কিশোরীর সঙ্গে আরও দুই ছেলের যোগাযোগের তথ্যও সামনে এসেছে।
প্রাথমিক তথ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয় ছিল এবং ওই ছেলেরা ইয়াংছায় এসে কিশোরীদের সঙ্গে দেখা করেছিল বলেও জানা গেছে।
তবে এসব তথ্যের সত্যতা এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার সঙ্গে এগুলোর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত জানা যাবে। এই বিষয়ে লামা থানা পুলিশের বিশেষ টিম কাজ করে যাচ্ছে।
পরিবার জিডি করেছে, মেয়েদের ফিরে পেতে আকুল আবেদন;
নিখোঁজ তিন কিশোরীর পরিবারের সদস্যরা লামা থানায় জিডি করেছেন বলে জানা গেছে। মেয়েদের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটছে তাঁদের। সন্তানদের নিরাপদে ফিরে পেতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন অভিভাবকেরা।
পরিবারের প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত তাদের অবস্থান শনাক্ত করে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে।
কুমারী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জামিল আহমেদ জানান, নিখোঁজের বিষয়টি জানার পর পুলিশ নিজ উদ্যোগে অনুসন্ধান শুরু করে। স্থানীয় সচেতন মহল ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আসার পর পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে।
তিনি অভিভাবকদের তদন্তের স্বার্থে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত মাসের শেষ দিক থেকে বিদ্যালয়ে অনিয়মিত ছিল তারা;
নিখোঁজ কিশোরীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইয়াংছা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মফিজ উদ্দিন জানান, গত মাসের শেষ দিক থেকে ওই শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে অনিয়মিত ছিল। স্থানীয় গণমাধ্যম ও প্রশাসনের মাধ্যমে তিনি তাদের নিখোঁজ হওয়ার খবর জানতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো অভিভাবক সরাসরি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। তবে তিনি নিজ উদ্যোগে তাদের খোঁজখবর রাখছেন এবং এ বিষয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছেন।
তিন কিশোরীর সন্ধানে সহযোগিতা কামনা;
১০ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে তিন কিশোরীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের নিরাপদে খুঁজে বের করতে পরিবারের সদস্য, সহপাঠী, পরিচিতজন ও স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কোনো ব্যক্তি তাদের দেখে থাকলে কিংবা অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানলে নিকটস্থ থানা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করা হচ্ছে।
তিন কিশোরীর পরিবার তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে। নিখোঁজের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং তাদের সন্ধান নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি সবার দায়িত্বশীল সহযোগিতা এখন জরুরি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো অনুমানকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে প্রচার না করারও আহ্বান জানানো হচ্ছে।