
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। বিশেষ করে রসুলবাগ ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক বেচাকেনা, কিশোর-তরুণদের সংঘবদ্ধ হওয়া এবং ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলাকার কিছু অংশে প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে মাদক কেনাবেচার কার্যক্রম চলছে। সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় অপরিচিত ও বিভিন্ন বয়সী মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। এতে স্থানীয় পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাদকের সহজলভ্যতার কারণে এলাকার তরুণ সমাজের একটি অংশ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন অভিভাবকরাও।
স্থানীয়দের দাবি, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের রসুলবাগ এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে একটি প্রভাবশালী চক্রের ভূমিকা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সুজন নামের এক ব্যক্তির প্রভাব এবং তার ভাই স্বপনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আরিফ ও তার পরিবারের সদস্যরা কথিতভাবে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এ কাজে ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে পরিচিত উজ্জ্বল, আরিফসহ আরও কয়েকজন সহযোগিতা করছেন বলেও স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, রসুলবাগ ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় সন্ধ্যার পর বিভিন্ন বয়সী মানুষের চলাচল বেড়ে যায়। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন, এসব এলাকায় মাদক সেবন ও বেচাকেনার কারণে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, মাদকের কারণে তরুণদের একটি অংশ বিপথে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তারা বলছেন, একটি এলাকায় মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়লে এর প্রভাব শুধু মাদকসেবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে নানা ধরনের অপরাধও বাড়তে পারে। তাই মাদক বিক্রির অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকেই ভয় পান। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে পরে বিভিন্ন ধরনের চাপ বা হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
তাদের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করলে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে হয়রানি না করে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মাদক ব্যবসার পাশাপাশি ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে চাঁদা দাবির অভিযোগও রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
কয়েকজন ব্যবসায়ীর দাবি, বিভিন্ন অজুহাতে তাদের কাছে টাকা দাবি করা হয়। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ব্যবসায়ীরা বলেন, তারা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে চান। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হুমকি, চাপ কিংবা চাঁদা দাবির কারণে ব্যবসায় স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হলে শুধু ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, এর প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
তাদের দাবি, চাঁদাবাজির অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এলাকায় মাদককে কেন্দ্র করে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ সংঘবদ্ধ হয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, ছোটখাটো বিরোধকে কেন্দ্র করে মারামারি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, দলবদ্ধভাবে চলাফেরা এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা মাঝে মধ্যে দেখা যায়।
এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সন্তানদের নিয়ে বাইরে বের হওয়া এবং তরুণদের চলাফেরা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
অভিভাবকরা মনে করেন, কিশোর-তরুণদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা সিদ্ধিরগঞ্জের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের যেসব এলাকায় মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে, সেসব স্থান চিহ্নিত করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তাদের দাবি, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক, সামাজিক বা অন্য কোনো পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তার পরিচয় বিবেচনা না করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগের সঙ্গে জড়িত নন—এমন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে যেন হয়রানি করা না হয়, সেদিকেও প্রশাসনকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সিদ্ধিরগঞ্জের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো দ্রুত তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো হবে।
স্থানীয়দের মতে, কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, মাদকবিরোধী অভিযান এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো গেলে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে বিদ্যমান আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। তারা দ্রুত প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছেন।