
কয়েক মাস আগে অচেনা পথ ধরে বান্দরবানের লামা উপজেলার ইয়াংছায় এসে আশ্রয় নিয়েছিল মানসিক ভারসাম্যহীন এক তরুণ। নাম আবদুর রহমান। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘কিউ’ নামে। কেউ জানত না তাঁর বাড়ি কোথায়, ছিল না কোনো পরিচয় কিংবা গন্তব্যের ঠিকানা।
তবে পরিচয়হীন সেই মানুষটিই অল্প সময়ের মধ্যে হয়ে ওঠেন ইয়াংছাবাসীর আপনজন। ইয়াংছা যাত্রী ছাউনিই হয়ে উঠেছিল তাঁর ঘর। পথচলতি মানুষ থেকে শুরু করে সিএনজি চালক—সবাই যেন তাঁর পরিবারের সদস্য হয়ে গিয়েছিল।
দিনের পর দিন ইয়াংছার মানুষ তাঁকে খাবার দিয়েছে, পরিয়েছে কাপড়, নিয়েছে শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ। কেউ তাঁকে দেখেছেন আপন ভাইয়ের মতো, কেউ সন্তানস্নেহে, আবার কেউ নিছক আনন্দের সঙ্গী হিসেবে। তাঁর সরল আচরণ, হাসি-ঠাট্টা ও মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার স্বভাব খুব অল্প সময়েই তাঁকে সবার প্রিয় করে তোলে।
তাঁর প্রতি সবচেয়ে বেশি যত্নশীল ছিলেন ইয়াংছা সিএনজি সমিতির লাইন সম্পাদক আরমান। নিজের আপন ভাইয়ের মতো করে কিউয়ের খোঁজখবর রাখতেন তিনি। খাবার, পোশাক, গোসল থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজন—সবকিছুতেই ছিল আরমানের আন্তরিক নজর।
এলাকার মানুষও মজা করে বলতেন, ‘কিউ আরমানের ভাই।’
এই সম্পর্ক ছিল রক্তের নয়, ছিল মানবিকতার।
ইয়াংছাবাসীর সঙ্গে কিউয়ের মায়া-মমতার নানা মুহূর্ত অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেন। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে বিষয়টি পৌঁছে যায় তাঁর পরিবারের কাছে। অবশেষে দীর্ঘদিন পর পরিবার জানতে পারে—তাদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষটি ইয়াংছায় রয়েছেন।
এরপর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন।
কিউকে নিতে ইয়াংছায় ছুটে আসে তাঁর পরিবার। খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁকে বিদায় জানাতে জড়ো হতে থাকেন এলাকার মানুষ। একপর্যায়ে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে ইয়াংছা পরিণত হয় এক আবেগঘন বিদায়স্থলে।
দৃশ্যটি দেখে অনেকেরই মনে হয়েছে, কোনো জনপ্রিয় মানুষকে বিদায় জানাতে যেন জনতার ঢল নেমেছে।
তবে সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া ছিল কিউয়ের আচরণ।
পরিবারের সঙ্গে চলে যাওয়ার সময় বারবার ইয়াংছার মানুষকে জড়িয়ে ধরছিলেন তিনি। যেন বোঝাতে চাইছিলেন—এই মানুষগুলোকেও তিনি ছেড়ে যেতে চান না। কারও সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন, কাউকে জড়িয়ে ধরছেন, আবার কারও দিকে তাকিয়ে দিচ্ছেন আবেগমাখা অভিব্যক্তি। মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
যে মানুষটির কোনো ঠিকানা ছিল না, সেই মানুষটির জন্যই যেন ইয়াংছায় তৈরি হয়েছিল এক বিশাল পরিবার।
তবে বাস্তবতা হলো—ইয়াংছা তাঁর আশ্রয় হয়ে উঠলেও প্রকৃত ঠিকানা তাঁর পরিবার। আপনজনদের কাছে ফিরে যাওয়াই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বুকের ভেতর মায়া জমলেও হাসিমুখেই তাঁকে পরিবারের হাতে তুলে দেন ইয়াংছা সিএনজি সমিতির সভাপতি সাবের আহমদ, লাইন সম্পাদক আরমানসহ ইয়াংছাবাসী।
বিদায়ের মুহূর্তে অনেকের চোখে ছিল পানি। কেউ কেউ বলছিলেন, ‘কিউকে আমরা ভুলব না।’
একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের প্রতি একটি এলাকার মানুষের এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের ঘটনা অনেককেই আবেগাপ্লুত করেছে। পরিচয়, সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থান নয়—মানুষকে আপন করে নিতে যে শুধু মানবিকতাই যথেষ্ট, কিউকে ঘিরে ইয়াংছাবাসীর এই গল্প যেন তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।
কয়েক মাস আগে যে মানুষটি ছিল সম্পূর্ণ অচেনা, বিদায়ের দিনে সেই মানুষটির জন্য শত শত মানুষের ভালোবাসা যেন প্রমাণ করে—মানবিকতার কোনো পরিচয়পত্র লাগে না।
পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া আবদুর রহমান ওরফে ‘কিউ’-এর সুস্থতা, নিরাপদ জীবন ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করেছেন ইয়াংছাবাসী।
অচেনা মানুষটি এসেছিল একদিন পথহারা হয়ে; ফিরে গেল শত মানুষের ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে।