
রিপন মিয়া, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি:
রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটে গরু বিক্রি করে বাড়ি ফেরার পথে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে নিখোঁজ হওয়া মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার কানাইনগর গ্রামের কৃষক মুজাম বিশ্বাস (৭০) চার দিন পর জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। আশুলিয়ার জিরানী বাজার এলাকার নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে খুঁজে পান স্বজনরা। তার সন্ধান মেলায় পরিবারে ফিরে এসেছে স্বস্তি, আনন্দ ও স্বজনদের মুখে হাসি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (২৬ মে) সকালে মেয়ের জামাই সুরুজ আলীকে সঙ্গে নিয়ে একটি ষাঁড় গরু বিক্রির উদ্দেশ্যে রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটে যান মুজাম বিশ্বাস। হাটে গরুটি ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করার পর নিরাপত্তার স্বার্থে বিক্রির টাকা অন্য একজনের মাধ্যমে আগেই বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। পরে রাত প্রায় ১টার দিকে শ্বশুর ও জামাই স্থানীয় একটি বাসে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
অভিযোগ রয়েছে, পথিমধ্যে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা কৌশলে তাদের চেতনানাশক কিছু খাইয়ে অচেতন করে ফেলে। পরদিন গাজীপুর এলাকা থেকে সুরুজ আলীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হলেও মুজাম বিশ্বাসের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এতে পরিবারজুড়ে নেমে আসে চরম উৎকণ্ঠা। নিখোঁজ বৃদ্ধকে খুঁজতে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে ছুটে বেড়ালেও তার কোনো হদিস মিলছিল না।
মুজাম বিশ্বাসের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সিংগাইর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে তার ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করে সন্ধান চাওয়া হয়। বিষয়টি দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই তাকে খুঁজে বের করার প্রচেষ্টায় অংশ নেন।
এদিকে আশুলিয়ার জিরানী বাজার এলাকার নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত পরিচয় এক বৃদ্ধের ছবি ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে তার স্বজনদের খোঁজ করতে থাকে। পরে সেই ছবি পরিচিতজনদের নজরে এলে তারা মুজাম বিশ্বাসের পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি অবহিত করেন। খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন হাসপাতালে গিয়ে তাকে শনাক্ত করেন।
জানা গেছে, এক মানবিক ভ্যানচালক আশুলিয়ার একটি সড়কের পাশে মুজাম বিশ্বাসকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে উদ্ধার করেন। পরে তিনি মানবিক বিবেচনায় তাকে নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করান। চিকিৎসকদের নিবিড় পরিচর্যায় শুক্রবার দুপুরে তার জ্ঞান ফিরলেও তিনি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। তার কথাবার্তায় অসংলগ্নতা রয়েছে এবং অনেক পরিচিত মানুষকেও ঠিকমতো চিনতে পারছেন না। এছাড়া তার ডান পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, যার কারণে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা ও দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে।
শুক্রবার (২৯ মে) দিবাগত রাত ১টার দিকে পরিবারের সদস্যরা তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। শনিবার (৩০ মে) সকালে সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর বর্তমানে তিনি বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরা তাকে বিশ্রামে থাকার পাশাপাশি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
মুজাম বিশ্বাসের ছেলে মোয়াজ্জেম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে আমাদের পরিবারে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল। কয়েকদিন ধরে ঈদকে ঘিরে আমাদের কোনো আনন্দ ছিল না। আমরা শুধু বাবার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে বাবাকে ফিরে পেয়েছি। বাবাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ আমাদের কাছে ঈদের আনন্দের চেয়েও বড়। তবে তিনি এখনো পুরোপুরি সুস্থ নন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তার চিকিৎসা ও দেখভাল চলছে।”
স্থানীয়দের মতে, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গবাদিপশুর হাটগুলোতে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। তাই গরু বিক্রি কিংবা কেনাবেচার সময় সাধারণ মানুষকে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হলে আইন অনুযায়ী উদ্ধার সংক্রান্ত আরেকটি জিডি গ্রহণ করে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।”
উল্লেখ্য, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন পশুর হাট ও গণপরিবহনে অজ্ঞান পার্টির সক্রিয়তার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এ ধরনের ঘটনা এড়াতে অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে জনসচেতনতামূলক পরামর্শ দিয়ে আসছে।