
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের অর্ধশতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকের দীর্ঘদিনের নৈশপ্রহরী ফিরোজ মিয়ার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও দিনের বেলায় তিনি ঋণসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, ঋণ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে ফাঁকা চেক, অলিখিত স্ট্যাম্প, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও ছবি নেওয়া হতো। পরবর্তীতে কোনো কোনো গ্রাহকের নামে প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ঋণ দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। ব্যাংকের নথিতে থাকা ঋণের পরিমাণের সঙ্গে হাতে পাওয়া অর্থের মিল না থাকায় নোটিশ পাওয়ার পর বিষয়টি জানতে পারেন কয়েকজন গ্রাহক।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—একজন নৈশপ্রহরী কীভাবে ঋণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং কার্যক্রমে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করলেন? ব্যাংকের তৎকালীন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বিষয়টি জানতেন কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
এ ঘটনায় ব্যাংকের তৎকালীন প্রিন্সিপাল ম্যানেজার শরীফ হাসান মুরাদের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে, গত ২০ জুলাই থেকে ফিরোজ মিয়া ব্যাংকে আসছেন না বলে জানিয়েছেন বর্তমান ব্যবস্থাপক। তার কাছে থাকা অর্থ ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গ্রাহকরা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।
ফিরোজ মিয়ার নামে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তার আয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
অন্যদিকে, চাঁদমিয়া নামে এক ঋণগ্রহীতা অভিযোগ করেন, তিনি দুই বছরের মেয়াদে ঋণ নেওয়ার পর তৎকালীন প্রিন্সিপাল অফিসার শরীফ হাসান মুরাদ তাকে এক বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের জন্য তাগাদা দেন। এতে তিনি হয়রানি ও আর্থিক চাপে পড়েন বলে দাবি করেন।
এর আগে ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংক শাখার ম্যানেজার মো. শরীফ হাসানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ তুলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত দাবি করা হয়। ওই প্রতিবেদনে ২০২৩ সাল থেকে নিজ এলাকায় কর্মরত থাকায় তার বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ ও বিভিন্ন অনিয়মের খবর প্রকাশের পর শরীফ হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত (ওএসডি) করা হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে তাকে কিশোরগঞ্জ থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে সোনালী ব্যাংক পিএলসির কুড়িগ্রাম করপোরেট অফিসের ডিজিএম শাখায় বদলি করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে এখন প্রধান প্রশ্ন—ফিরোজ মিয়া কোথায়? তার কাছে থাকা গ্রাহকদের অর্থ ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের কী হয়েছে? পাশাপাশি, ঋণ প্রক্রিয়ায় একজন নৈশপ্রহরীর এমন সম্পৃক্ততার পেছনে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণে যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।