
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দর পরিদর্শন করেছেন ভূটানের গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি অথরিটি (GMCA)-এর একটি প্রতিনিধি দল। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) প্রতিনিধি দলটি সোনাহাট স্থলবন্দর পরিদর্শন করে। এ সময় বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা, যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কুড়িগ্রামে প্রস্তাবিত ভূটানি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, সোনাহাট স্থলবন্দর এবং চিলমারী নদীবন্দরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভূটানের মধ্যে ভবিষ্যতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। প্রতিনিধি দলের এ সফরকে সেই সম্ভাবনা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিদর্শনকালে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা সোনাহাট স্থলবন্দরের বর্তমান অবকাঠামো, পণ্য পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। একই সঙ্গে বন্দরের ইমিগ্রেশন কার্যক্রম, যোগাযোগব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ ও সোনাহাট স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. বদিউজ্জামানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুড়িগ্রামে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন এবং এর সঙ্গে ভূটানের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিনিধি দলটি বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে।
বিশেষ করে কুড়িগ্রাম থেকে সোনাহাট স্থলবন্দর হয়ে ভূটানের দূরত্ব, বর্তমানে এ বন্দর দিয়ে কোন কোন পণ্য আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে, ভবিষ্যতে নতুন কী কী পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা যেতে পারে এবং বন্দরের ইমিগ্রেশনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা তথ্য নেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে পাথর, কয়লা, তাজা ফল, ভুট্টা, গম, চাল, ডাল, রসুন, আদা ও পেঁয়াজসহ ২২টি পণ্য আমদানির সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ভূটান থেকেও বিভিন্ন পণ্য আমদানির অনুমতি রয়েছে। বর্তমানে এ বন্দর দিয়ে ভারত থেকে প্রধানত পাথর ও কয়লা আমদানি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে গার্মেন্টস ঝুট, প্লাস্টিক পণ্য, জুস, টয়লেট টিস্যু, মশারি, বই ও তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য।
জানা যায়, প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করে। চিঠিতে বলা হয়, ভূটানের গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি অথরিটি (GMCA)-এর একটি প্রতিনিধি দল ৩১ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করছে।
এ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (BEZA)-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করা এবং কুড়িগ্রাম পরিদর্শন। কুড়িগ্রাম সফরের অংশ হিসেবে ভূটানি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, সোনাহাট স্থলবন্দর এবং চিলমারী নদীবন্দর পরিদর্শনের কথা সফরসূচিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিনিধি দলে ছিলেন GMCA-এর ডেপুটি ডিরেক্টর কালডেন দর্জি এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক অ্যাফেয়ার্সের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর নিম লাম। সফরটি সমন্বয় করেন ঢাকায় রয়্যাল ভূটানিজ এম্বাসির মিনিস্টার-কাউন্সেলর (ট্রেড) দাওয়া শেরিং।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসন্ন BEZA-GMCA Joint Working Group Meeting-এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই প্রতিনিধি দলের এ সফর। এর মাধ্যমে কুড়িগ্রামে ভূটানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ নিয়ে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম ও ভূটানের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের সম্ভাবনার বিষয়টি নতুন নয়। এর আগে ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ ভূটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে কুড়িগ্রামের সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে ভারত হয়ে সড়কপথে ভূটানে ফিরে যান।
ওই দিন তিনি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের মাধবরাম এলাকায় ভূটানের জন্য প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান পরিদর্শন করেন। সেখানে বিজিবির পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার ও বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
সফরের সময় বাংলাদেশ ও ভূটানের মধ্যে কুড়িগ্রামে ভূটানি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। ভূটানের সরকারি যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি ভূটানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর গেলেফু থেকে প্রায় ১৯০ কিলোমিটার দূরে।
এদিকে গেলেফুকে ঘিরে ভূটানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের পরিকল্পনার সঙ্গে কুড়িগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থার সম্ভাবনাকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সোনাহাট স্থলবন্দর ব্যবহার করে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কুড়িগ্রামে প্রস্তাবিত ভূটানি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে সোনাহাট স্থলবন্দর দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে চিলমারী নদীবন্দরকে কাজে লাগিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় GMCA প্রতিনিধি দলের সোনাহাট স্থলবন্দর, কুড়িগ্রামের প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চিলমারী নদীবন্দর পরিদর্শনকে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিদর্শনের সময় প্রোটোকল ও সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেবনাথ, সোনাহাট স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. বদিউজ্জামান, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন, স্থানীয় ব্যবসায়ী, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম আকন্দ এবং কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের কয়েকজন প্রতিনিধি।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, প্রতিনিধি দলের এ সফরের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম ও ভূটানের মধ্যে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হবে। পাশাপাশি প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সোনাহাট স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে।