
নাটোরের লালপুরে পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। হঠাৎ করে নদীর স্রোত তীব্র হওয়ায় উপজেলার বিলমাড়ীয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের নওসারা সুলতানপুর পদ্মার চরে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় ৩০টি পরিবারের বসতবাড়ি ও বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি। ভিটেমাটি হারিয়ে এসব পরিবারের অনেকেই এখন আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) নওসারা সুলতানপুর পদ্মার চরে এ তীব্র নদীভাঙন দেখা দেয়। স্থানীয়দের দাবি, পদ্মা নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্রোতের তীব্রতা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই নদীর পাড়ে ভাঙন শুরু হয়। চোখের পলকেই বসতবাড়ি, গাছপালা ও ফসলি জমি নদীর পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে। আকস্মিক এ ভাঙনে অনেক পরিবার তাদের দীর্ঘদিনের বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, নওসারা সুলতানপুর চরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করে আসছেন। তবে এবার হঠাৎ করে ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক পরিবার নিজেদের ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পায়নি। চোখের সামনে বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীতে বিলীন হতে দেখে অসহায় হয়ে পড়েছেন তারা।
নদীগর্ভে বিলীন হওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে রয়েছেন—আবের প্রামানিক, বানের প্রামানিক, আশরাফ প্রামানিক, সাইদুল মন্ডল, সাইদুল ইসলাম, বিমলা খাতুন, হামেদ মন্ডল, কামরুল মন্ডল, রাজিয়া খাতুন, ঝর্ণা খাতুন, জামাত মোল্লা, শহীদ সরদার, নবাব আলী, কহিনুর, আনোয়ারা বেগম, আনারুল প্রামানিক, সুখেজান খাতুন, সাহাজুল ইসলাম, বুলুয়ারা খাতুন, শান্তি বেগম, কুদ্দুস সরদার, আমাল আলী, শান্তি আক্তার, রেবেকা খাতুন, রফিকুল ইসলাম, ফেরদৌসী খাতুন, রেজাউল মন্ডল ও জালেফ মন্ডলসহ আরও কয়েকটি পরিবার।
বিলমাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আনোয়ার হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে পদ্মার স্রোতের তীব্রতা আচমকা বেড়ে যায়। এতে মুহূর্তের মধ্যেই নওসারা সুলতানপুর চরের প্রায় ৩০টি পরিবার তাদের বসতবাড়ি হারিয়েছে। পাশাপাশি বহু ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় আরও অনেক বসতভিটা ও আবাদি জমি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, “নদীভাঙনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। অনেকেই ঘরবাড়ি হারিয়ে বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আরও পরিবার ও জমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীভাঙনের কারণে শুধু বসতবাড়িই নয়, তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন ফসলি জমিও হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক পরিবারের ঘরবাড়ির পাশাপাশি গবাদিপশু রাখার জায়গা, গাছপালা ও বিভিন্ন কৃষি উপকরণও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে একদিকে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তারা।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, ভাঙন রোধে দ্রুত নদীর তীর সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য, আশ্রয় ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে বিলমাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ছিদ্দিক আলী মিষ্টু বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়েছে।
লালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবীর হোসেন বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।”
এদিকে নদীভাঙন অব্যাহত থাকায় নওসারা সুলতানপুর চরের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরও বসতবাড়ি ও আবাদি জমি পদ্মার গর্ভে বিলীন হতে পারে। তাই ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।