
মো. ফরিদ হোসেন,মানিকগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি।।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ৪০ দিনের কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়নাধীন চন্দ্রখালী খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গৃহীত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তারা অভিযোগ করেন, সরকারি নথিতে উল্লেখিত ব্যয় এবং মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্য রয়েছে। এ কারণে প্রকল্পের সকল নথিপত্র ও বাস্তব কাজের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে গাজীখালী নদীর সংযোগস্থল থেকে সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়নের হাজিপুর, গোপালনগর হয়ে ভেইরা পাড়া সুইচ গেট পর্যন্ত ৬ দশমিক ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ চন্দ্রখালী খাল পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
প্রকল্পের আওতায় ৩০ লাখ ৬ হাজার ১২ ঘনফুট মাটি কাটার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এবং এ কাজের জন্য ২ কোটি ৮৩ লাখ ২৭ হাজার ৬২৩ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ১১ মে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন সংসদ সদস্য ও বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটি শ্রমনির্ভর হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ কাজেই শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু (খননযন্ত্র) ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া একাধিক বিল-ভাউচার প্রস্তুত, সীমিতসংখ্যক শ্রমিক দিয়ে আগাছা পরিষ্কারের কাজ করিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো এবং প্রকৃত কাজের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় দেখানোর অভিযোগও তুলেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের আরও দাবি, প্রকল্পের মোট বরাদ্দের প্রায় ৬৫ শতাংশ ব্যয় দেখিয়ে অবশিষ্ট অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ব্যয়ের চিত্র গোপন করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, প্রকল্পের অনুমোদনপত্র, বিল-ভাউচার, মাস্টার রোল, শ্রমিকের উপস্থিতির তালিকা এবং মাঠপর্যায়ে সম্পন্ন হওয়া কাজের বাস্তব অবস্থা মিলিয়ে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) খলিলুর রহমান মোল্লা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “প্রকল্পের সব কাজ সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। অনিয়মের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।”
অন্যদিকে, আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্পে ভুয়া ব্যয় দেখানো, জাল বিল-ভাউচার তৈরি, মাস্টার রোলে অনিয়ম কিংবা সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী, সুশীল সমাজ ও সচেতন মহল সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে।