
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঠিকাদারদের সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যাতায়াতের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয়। এরপর গড়ে ওঠে ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অভিযোগ রয়েছে, সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মৌসুমী আক্তার লিমার বিরুদ্ধে।
বিশেষ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কয়েকজন কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে ‘হানিট্র্যাপ’-এর মাধ্যমে ফাঁদে ফেলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। প্রতিবেদকের হাতে থাকা কিছু নথি, যোগাযোগের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
বিমানের কর্মকর্তাদের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ
প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একাধিক কর্মকর্তাকে বিভিন্নভাবে ফাঁদে ফেলার অভিযোগ রয়েছে মৌসুমী আক্তার লিমার বিরুদ্ধে।
চাকরি ও পারিবারিক নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই ব্যক্তি দাবি করেন, মৌসুমী একা নন; তার সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকতে পারে। তাদের অভিযোগ, অবৈধ পণ্যের চোরাচালান বন্ধে তৎপর এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কর্মকর্তাদের বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়া কিংবা বিভিন্ন ধরনের অবৈধ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কিছু অসাধু কর্মচারী এবং বিভিন্ন টেন্ডারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ও ঠিকাদারদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে বিমানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও চাপের মুখে পড়তে পারেন।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নানা তথ্য
মৌসুমী আক্তার লিমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সম্পর্ক নিয়েও বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। প্রতিবেদকের হাতে থাকা কিছু নথিতে ব্যাংকার, আইনজীবী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার যোগাযোগের তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমীর প্রথম বিয়ে পঞ্চগড়ের মিলন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে হয়েছিল বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর রিশান নামে আরেক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন তিনি।
তবে দ্বিতীয় বিয়ের নিকাহনামায় নিজের বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ করা হয়েছে বলে নথিতে দেখা গেছে। এ বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে
নিয়মিত আয় না থাকলেও ৩ লাখ টাকার এফডিআর
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমী আক্তার লিমার নামে ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংকে ৩ লাখ টাকার একটি এফডিআর করা হয়। তার নিয়মিত আয়ের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় ওই অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এফডিআরের অর্থের প্রকৃত উৎস কী এবং তা বৈধ কি না—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা মৌসুমী আক্তার লিমার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ছয় মাসে ৩২৯ বার ফোনকলের তথ্য
প্রতিবেদকের হাতে আসা কথিত কললিস্টের তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসে মৌসুমীর একটি নম্বর থেকে তার প্রথম স্বামী মিলনের নম্বরে ৩২৯ বার ফোন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া পঞ্চগড়ের আইনজীবী ও পাথর ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত আক্তারুল আলমের সঙ্গেও তার যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। সাভারের চাপাইন এলাকায় তাদের একাধিকবার দেখা হওয়ার কথাও জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে আক্তারুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাদের দেখা হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
এছাড়া সিলেটের একটি ব্যাংকের সঙ্গে মৌসুমীর যোগাযোগের বিষয়েও তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব যোগাযোগের প্রকৃতি বা এর সঙ্গে কোনো অনিয়মের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলেননি মৌসুমী
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে মৌসুমী আক্তার লিমার বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
তবে তিনি ক্যামেরার সামনে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। প্রতিবেদকের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ না দিয়ে গেটের নিরাপত্তাকর্মীর মাধ্যমে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদকের দাবি।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।