
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার তিল্লি ইউনিয়নের কৃষি মাঠে দেখা মিলছে এক ব্যতিক্রমী শ্রমবাজারের। এখানে জমিতে চাষাবাদ, আগাছা পরিষ্কার, রোপণসহ বিভিন্ন কৃষিকাজে কৃষিশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করা হচ্ছে ঘণ্টা হিসেবে। বর্তমানে কাজের ধরন ও সময়ভেদে ঘণ্টাপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে কৃষকদের।
বিষয়টি নিয়ে তিল্লি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি মো. ফরিদ হোসেন। কৃষকদের সঙ্গে আলাপকালে উঠে এসেছে কৃষিশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার নানা বাস্তব চিত্র।
কৃষিপ্রধান এই এলাকায় ঘণ্টাভিত্তিক শ্রমের মজুরি অনেকের কাছে ব্যতিক্রমী মনে হলেও কৃষকদের কাছে এটি এখন বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ বিষয়টিকে রসিকতা করে বলছেন, ‘ইউরোপের মতো এখানেও ঘণ্টা হিসেবে মজুরি—এ যেন এক টুকরো ইউরোপ!’
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষিকাজের মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক পাওয়া গেলেও তাদের পারিশ্রমিক এখন অনেকটাই কাজের সময়ের ওপর নির্ভরশীল। নির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্য কত সময় শ্রম দিতে হবে, তার ওপর ভিত্তি করে মজুরি নির্ধারণ করা হচ্ছে।
কৃষকদের ভাষ্য, আগে কৃষিশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে দিনভিত্তিক হিসাব বেশি প্রচলিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন কৃষিকাজে ঘণ্টাভিত্তিক মজুরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে একদিকে কৃষকের কাজের সময়ের হিসাব যেমন স্পষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে কৃষিকাজের ব্যয়ও।
তিল্লির এক কৃষক প্রতিনিধি মো. ফরিদ হোসেনকে বলেন, জমিতে সময়মতো কাজ শেষ করতে শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ঘণ্টাপ্রতি মজুরি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা হওয়ায় দীর্ঘ সময় শ্রমিক নিয়োগ করলে খরচ অনেক বেড়ে যায়। এতে ফসল উৎপাদনের আগেই কৃষককে বাড়তি ব্যয়ের হিসাব করতে হচ্ছে।
তিল্লি ইউনিয়নের কৃষকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, কৃষি উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই এখন ব্যয় বেড়েছে। জমি প্রস্তুত করা, চাষাবাদ, বীজ, সার, সেচ, আগাছা পরিষ্কার, চারা রোপণ থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে অর্থ ব্যয় করতে হয়।
এর মধ্যে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় মোট উৎপাদন খরচ আরও বাড়ছে। ফলে বাজারে ফসল বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন অনেক কৃষক।
কৃষকদের মতে, কৃষিশ্রমিকদের পারিশ্রমিক বাড়ার পেছনে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিও একটি কারণ। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দেওয়ার বিষয়টি তারা অস্বীকার করছেন না। তবে একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত হলে তারা আরও আগ্রহ ও আন্তরিকতার সঙ্গে কৃষিকাজে যুক্ত থাকবেন। এতে কৃষির উৎপাদন ব্যবস্থাও সচল থাকবে।
তবে কৃষকদের প্রশ্ন—শ্রমিকের মজুরি যদি বাড়ে, উৎপাদন খরচ যদি বাড়ে, তাহলে কৃষিপণ্যের দাম সেই অনুপাতে না বাড়লে কৃষক কীভাবে টিকে থাকবেন?
তিল্লির কয়েকজন কৃষক বলেন, কৃষক ও কৃষিশ্রমিক পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। একজনের শ্রমে অন্যজনের উৎপাদন হয়। তাই উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করেই কৃষি খাতকে এগিয়ে নিতে হবে। শ্রমিককে ন্যায্য মজুরি দেওয়ার পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিল্লি ইউনিয়নের কৃষি মাঠ ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের ব্যস্ততা। কেউ জমিতে আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ চারা রোপণ করছেন, আবার কেউ জমির অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাদের শ্রম ও ঘামে ফসলের মাঠ হয়ে উঠছে সবুজ।
কৃষকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, সময়মতো জমির কাজ শেষ করতে না পারলে ফসলের উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই মজুরি বেশি হলেও অনেক সময় বাধ্য হয়েই শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়।
এক কৃষক বলেন, ‘শ্রমিক ছাড়া কৃষিকাজ করা কঠিন। আবার শ্রমিকের মজুরি বেশি হলে আমাদের খরচও বাড়ে। ফসল বিক্রি করে যদি সেই খরচের তুলনায় লাভ না থাকে, তাহলে কৃষকের জন্য বিষয়টি কঠিন হয়ে যায়।’

ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কৃষিশ্রমিকের মজুরি শুনে স্থানীয়দের কেউ কেউ মজা করে বলছেন, ‘এ যেন এক টুকরো ইউরোপ।’ কিন্তু এই রসিকতার আড়ালে রয়েছে কৃষক ও শ্রমিকের জীবন-জীবিকার কঠিন বাস্তবতা।
একদিকে শ্রমিকরা তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য চান, অন্যদিকে কৃষক চান উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফসলের ন্যায্যমূল্য। দুই পক্ষের এই বাস্তব চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা এখন কৃষি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিল্লির কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তাতে বোঝা যায়—কৃষিশ্রমের মূল্য শুধু শ্রমিকের আয় বাড়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে কৃষকের উৎপাদন খরচ, ফসলের বাজারদর এবং কৃষির ভবিষ্যৎ।
কৃষকের ঘাম ও কৃষিশ্রমিকের শ্রমেই দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা টিকে আছে। তাই কৃষিশ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে উভয় পক্ষই উপকৃত হবে বলে মনে করছেন তিল্লির কৃষকরা।
সব মিলিয়ে, তিল্লি ইউনিয়নের কৃষি মাঠে ঘণ্টাভিত্তিক ১২০ থেকে ১৫০ টাকা শ্রমিকের মজুরি স্থানীয়দের কাছে যতটা চমকপ্রদ, এর পেছনের বাস্তবতা ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। ‘এ যেন এক টুকরো ইউরোপ’—এই রসিকতার আড়ালে আসলে উঠে আসছে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকের পরিশ্রম, বাড়তে থাকা উৎপাদন ব্যয় এবং ন্যায্যতার দাবির এক বাস্তব চিত্র।